ফালগুনী রায় : বাংলা কবিতার কিংবদন্তিপুরুষ / সুবিমল বসাক

ফালগুনী রায় । সে হতে চেয়েছিল ফালগুনীরায় । কবি ফালগুনীরায় । নিজের আইডেনটিটিকে জোরদার করার প্রথম ধাপ: নাম। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর এই পৃথিবীর ধুলো, রোদ, বৃষ্টি, বায়ু-দূষণময় এই জগতে নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিল সে । মৃত্যু ৩১ মে ১৯৮১। বয়স পঁয়ত্রিশ বছর বেঁচে থাকা বাস্তবিকই কঠিন। জীবিত থাকলে ফালগুনীর বয়স আমাদের সমান হতো। হয়তো রেখে যেত আরো কিছু কবিতা/গদ্য/প্রবন্ধ । হয়তো এই কারণে যে পরবর্তী সময়ে মেধা ও অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতা-জাত বোধ তাকে কোথায় ঠেলে নিয়ে যেত জানা নেই। কবি হিসাবে তার পরিণতি, মৃত্যু সময়াবধি, যা দেখেছি, অস্বাভাবিক ছিল না ।

সুবিমল বসাকের আঁকা ফালগুনী রায়

শহিদ নয়; আত্মহনন ছিল তার অভীপ্সা। জেব্রা   দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রথম কবিতা প্রকাশের কালানুক্রমে, তার কবি জীবন মাত্র ১৩ বছর। এই ১৩ বছরে সে রেখে গেছে কিছু কবিতা, চিত্রনাট্য, গল্প, সমালোচনা — যা থেকে বাছাই করে প্রকাশ করা হয়েছিলনষ্ট আত্মার টেলিভিশন , বাসুদেব দাশগুপ্তের প্রকাশনায় — ছোট, সাজসজ্জাহীন, আটপৌরে, ১৬ পৃষ্ঠা, হাফ ক্রাউনে, চটি — এই কবিতা-পুস্তক। ১৫ই আগস্ট ১৯৭৩ সনে প্রকাশিত ।

১৯৬৪-৬৫এর ভয়ঙ্কর অবস্হায়। হাংরি জেনারেশানের মামলা কোর্টে — কেসের ডেট, অ্যডজোর্ন, অ্যাপিল, হীয়ারিং, সাক্ষি-ফরিয়াদি, দালাল-ফড়ে, পুলিশ-ফেউ, উকিল-পেঙ্গুইন, সোয়াল-জবাব, কাঠগড়া-আসামী-সরকারপক্ষ — এসব মুদ্রার এক পিঠ; অপর পিঠে সাহিত্যিক ও সাহিত্য-নির্ণায়কদের ভ্রুকুটি, তৎপরতা, খুরপি হাতে সমূলে উপড়ে ফেলার সদিচ্ছা। Continue reading

Leave a Comment

Filed under সারথি

contemporary art series of bangladesh (1976-77)

১৯৭৬-৭৭ সালে তৎকালীন সময়ের শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজন করে CONTEMPORARY ART SERIES OF BANGLADESH সিরিজের LIFE IN BANGLADESH শিরোনামের প্রদর্শনী। জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান সহ ২৯ জন শিল্পীর মোট ৩৩ টি শিল্পকর্ম নিয়ে চলে এ আয়োজন। এই প্রদর্শনীটির ক্যাটালগ নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন…

কৃতজ্ঞতায় । সাপলুডু

Leave a Comment

Filed under সারথি

সুরের জন্ম-মৃত্যু : দ্বিতীয় পর্ব / কফিল আহমেদ

প্রায়ই দেখি ফুল ফুটে আছে। গ্রামের গোপাটে ঘন ঘাসের কাঁথা ভরে ছোটো ছোটো সাদা সাদা ফুল আর ফুল। এমন সুন্দর যে চোখভরে মমতার জল চলে আসে। অজান্তেই পিষ্ট হয়। এমন ভয় যে, সন্ধ্যায় মনে হয়েছিলো আগামীকাল সকালের সূর্যের দেখা পাবে তো? ফলে গোপনে প্রতিজ্ঞা জন্মে। কিংবা সেই আমভর্তি একটা গাছ। হাসছিলো। একদিন দেখি, অনেকে পাতাসুদ্ধ সব আমই নাই হয়ে গেছে। তখন তাকে মনে হয়েছিলো সব সন্তানছিন্ন মায়েদের মতো। ফাঁকা। ফলে বেদনার জন্ম। যেখানেই যাই, গিয়েছি- চোখভরে তাকাই। তাকিয়েছি। শুনেছি এসব জীবন কিংবা প্রকৃতির বিধান। সব নাকি খণ্ডন করা যায় না। কিন্তু প্রতিজ্ঞা আরো ঘন আরো নিবিড় হয়ে নিজের মনেই ঘুরতে থাকে। আপন পরিবেশে কখনো তা কথা হয়ে সুর হয়ে বেরিয়ে এসেছে। প্রথমে কথা তারপর সুর- আমার বেলায় কখনোই তা ঘটে নাই। একই সাথে জন্মেছে। আর গাইতে গাইতে ঢোল-তবলার বোল শুনে মন বলেছে- হায়! এযে আমাদেরই চেনাজানা গরুমোষের হাড়মাংস খুলে নেবার পর তারই চামড়া জড়ানো আরেক হালচাষ। তাই কখনো কথাটা এমন হলো- তোমার মাথার খুলি করোটি ও হাড়ে বানিয়েছি ডুগডুগি বাজাও বাজাও। ওসব আমার কখনোই লিখে রাখা হয়নি। কিছু কিছু নিজের মনে ছিলো, আর বেশিরভাগই যাদের সঙ্গে বসেছি গেয়েছি তারাই মনে রেখেছে, মনে করিয়ে দিয়েছে। কথা হচ্ছে বিস্ময়ের অপরদিকে খুব লুকানো আটসাঁট বিপন্নতা- তাও বেজে ওঠে!

কেবল মরণে জীবনের আলিঙ্গন স্পষ্ট হবার নয়। যেকোনো সমাধির সাথে পৃথিবীর বুকের দিকটার ব্যবধান বেড়ে তা আরো নিরেট হয়ে যায়? কিন্তু সামনে এমন মরণ যেনো আর না হয়, এই আশায় আরো প্রতিজ্ঞা রাখি। heart! দেখেছি। জেনেছি তা অনেকটা মুষ্টিবদ্ধ হাতের মতোই। রক্তগোলাপের উন্মুখ কলির মতোই। ঠিক অনেকটা শঙ্খের মতোই আর গানে প্রাণের প্রকাশে সে তো খুব জরুরি। ওখানে অসুখ হলে কি খুব বিপদ? Continue reading

Leave a Comment

Filed under সারথি

আমাদের অপরূপ জট খুলে যাবে আয়নাব্যাখ্যায় : মজনু শাহ’র জেব্রামাস্টার নিয়ে আলাপ-সালাপ/মুহিত হাসান

‘বর্ণমালা, আমার হাওয়াঘর। মেয়েপুতুলের বেণী ছাড়া আর কিছু রচনায় আমি কি পারঙ্গম!’  -মজনু শাহ
 

মজনু শাহ’র চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ জেব্রামাস্টার পড়তে গিয়ে মনে হলো, সোজা-সাপটা কথায়—গোটা বইটাই অন্যরকম। দিনলিপির ভঙ্গিতে লেখা এরকম গদ্যগন্ধী কবিতা হয়তো বাংলা-কবিতার জগতে খুব একটা দুর্লভ নয়, কিন্তু তাও বলতে হবে যে জেব্রামাস্টার-এর কবিতাগুলোয় এমন একটা অনির্ণেয় স্বর শোনা যায়, যা আজতক আমাদের কাছে অনাস্বাদিত পৃথিবীর মতোন। কবির ভাষাও এ বইতে গড়ে উঠেছে আলাদা আঙ্গিকে—সূক্ষ্ণ বুননবাদী এক মহাজাগতিক কারুকলার ঝোঁকে। বইটির উপক্রমণিকাতেই তিনি একদম সরাসরি লেখেন :

[...] আজ আমার সকল সৃষ্টিছাড়া পঙক্তির গায়ে বিকেলের স্নান স্বর্ণচ্ছায়া এসে পড়ুক, কিম্বা তার পাশে জ্বলে উঠুক শুকনো পাতার স্তূপ। ব্যাধ ফিরে এসে দেখবে, ছাই উড়ছে শুধু।   [পৃষ্ঠা ৫]

এক্ষেত্রে কবির অভিপ্রায় যেন যাবতীয় পঙক্তির ভস্ম চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ তিনি জানেন, আনন্দের খুব কাছে সত্য আসে না, অতএব ভাঙা বেহালার ভেতর নিজের সমস্ত পাপ ঠেসে ভরাই তাঁর উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। এবং যেসব পাখি মৌরিজঙ্গল ছেড়ে সাগরের পথে উড়েছিলো, তাদেরকেও ফিরিয়ে আনতে চান এই কবিতার দেশে। কুহকী অস্তিত্বের ভার ঠেলে, কবির দেখার বস্তু হয়ে ওঠে জেব্রাদের উন্মাদ-দৌড়। একটু দাঁড়িয়ে থেকে বুঝে নেবেন কীভাবে ‘‘মৃত পাতা মৃত ফুল ছড়ানো পথের কিনারে ভোরবেলা দীর্ঘ কোনো গাছের গা বেয়ে কীভাবে একটি নিঃসঙ্গ শিশির মিশে যায় মৃত্তিকায়, ধীরে।’’ জলপাই গাছে এসে বসা অচেনা পাখিদের সহস্র বছর আগে বা পরের দার্শনিক জ্ঞান করে সেই ভ্রমও মিশিয়ে দেন কবিতায় (অবশ্য উল্লেখিত ভ্রমের মাধ্যমে শেষমেশ আমরা আচমকা এক ঘূর্ণিপাকে অবাস্তবের বোধে ভ্রমণই করে আসি যেন কবির সঙ্গে!)।

জেব্রামাস্টার গ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতা শিরোনামহীন। একটু অন্যভাবে দেখলে মনে হবে, প্রত্যেকটি আলাদা কবিতা মিলেই হয়তো একটা গোটা কাব্য-আখ্যান গড়ে তুলেছেন মজনু শাহ—প্রচলিত রোজনামচার ধরনে-গড়নে। কোনো ব্যক্তিবিশেষের শিল্প-যাপনের কথকতাও একে বলা যায়, যদিও সেই বয়ান নির্দিষ্ট কারো হয়ে যায়নি। বরং সকল সংবেদী মানুষের পরাণঘেঁষা আত্মকথায়ও পরিণত হয়েছে কখনো-সখনো। তাঁর নির্জনতার ভাষায় তৈরি ‘অসংশোধিত’ কবিতাগুলো শিল্পের অসম্ভব অসুখে আক্রান্ত যেকোনো ব্যক্তিরই কাছে এক পরম চিকিৎসা হয়ে ধরা দেয় :

[...] আমার ভাষা তৈরি হয় সেই নির্জনতায়, জেব্রা যেখানে তার শাবকদের নিয়ে খেলা করে। বহু খুঁজে, পেয়েছি পেজমার্কার, একটি উজ্জ্বল বিয়োগচিহ্ন আর ডালিমফুলের ছায়া। বন্ধ দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে, লিখতে শুরু করি। একদিকে অসানোগ্রাফির ক্লাশ, অন্যদিকে তোমার সঙ্গে সাঁতার কাটার ইচ্ছে। তাসের ঘরে এলেই প্রশ্ন করো, আমি কি তুলোরাশির জাতক? ঘর অন্ধকার করে শুধাই, তুমি কি কাননবালা? প্রশ্নেরা আজ হাসির কারাগার যেন। তোমার শরীর থেকে তখন ঘাসের গন্ধ আসে। জানালা খুলে দেই অতঃপর শান্ত হাতে। পাখিবাজার থেকে ফেরে লাঞ্ছিত লোকজন, নক্ষত্রের আলো আসে আমাদের তাসের ঘরে। [পৃষ্ঠা ৭] Continue reading

Leave a Comment

Filed under সারথি

সুরের জন্ম মৃত্যু / কফিল আহমেদ

যাবে। যেতে পারে। যদি ঘুমগুলি পাতাগুলি
হাতে না ঝরে!
তবে কথা হবে ফুলগুলি পাতাগুলি গাছে গাছে যে রকম দোলে
এই দোলা একসাথে
মেয়েটিরও
ছেলেটিরও
শ্রমিকেরই গায়ে গায়ে লাগে!
দেখামাত্রই গুলি, ওকে দেখা মাত্রই সনাক্তকরণের চিহ্নগুলি চোখ বুঁজে হাসে!
 
(কচুরিপানারা পাতা ফুটিয়ে কথা বলছিলো, নভেম্বর ২০০২)
 

গানের সামনে জীবনের ছন্দদোলাটা এরকমই। ওতপ্রোত। একদম বিজড়িত। নিত্যসঙ্গী। ঐকতানে ঐকতানে যাত্রাপথ আরো আলোকিত। প্রাণবন্ত। স্বপ্ন? না, তা কেবলই কোনো ’নির্বাণ বুদ্ধির স্বপ্ন’ না।

এর অনেক বাস্তবিক সঙ্গতি অসঙ্গতি আছে। সব দেখা অদেখার মাঝে তার আরো একান্ত কাছের, আরো বহুদুরের কোনো দীর্ঘ আলোর যাত্রা আছে। আলোর আধাঁরিয়া ভেঙে বেঁচে থাকবার আরো একান্ত বিজ্ঞান আর সর্বসংহতির আরো নিজস্ব অনুভব আছে। অনুভবের এই বিজ্ঞান যেনো প্রতিমুহূর্তেও শ্বাস-নিঃশ্বাস। অস্তিত্ব। সব দমবদ্ধতার চোখেমুখে জীবন্তের উঁকি। টুইনিঙ।

আর সেই টুইনিঙটা একদিন সে যেনো দেখতে বীজপত্র।

কেবল দেখতেই নয়, কেউ না জানলেও সে যেনো চোখ ঠোঁট নবজন্মের। Continue reading

3 Comments

Filed under সারথি

সুপার হিরোর ধর্মভাব / ওয়াহিদ সুজন

মানুষের ইতিহাসে ‘বুদ্ধিবৃত্তি’র দীর্ঘ রূপান্তরের সর্বশেষ ধাপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়, বলা হয় এ ধাপে এসে ‘অযৌক্তিক’ যে কোনো কিছু ত্যাগ করছে মানুষ। বুদ্ধিবৃত্তির এ রূপান্তর মিথ বা পুরানকে মিথ্যা,অদরকারি ও বাতিল ধার্য করে অগ্রাহ্য করেছে। অথচ অন্য অনেক ‘অদরকারি’ কিছুর মতো এ পুরান পুরোপুরি অদৃশ্য হয় নাই,বরং এর নানা রূপ মানুষের দুনিয়ায় রয়ে গেছে।

আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিতে অযৌক্তিক, কাজেই অদরকারি, ফলে অগ্রাহ্য থাকা এ পুরান হাজির আছে চলচ্চিত্রেও। এ আলোচনা খুবই সামান্য। বলা ভালো, এ পুরান কাহিনী আধুনিকতার মানদণ্ডে মূলত ‘ধর্মীয়’ আখ্যান। যেমন চলচ্চিত্রের ‘সুপার হিরো’।

হাতের কাছে সবশেষ উদাহরণ বলিউডের রা.ওয়ান। অনুভব সিনহা’র ২০১১’র এ চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে অনেকে হয়তো ভাবছিলেন এটা কি কল্প-বিজ্ঞান না মিথের (অ)যৌক্তিক কারিশমা! রা.ওয়ান এ চলচ্চিত্রের খলনায়ক। আর নায়ক? জি.ওয়ান। সে এক সুপার হিরো – অতিমানবীয় ক্ষমতার দাবিদার।

১৯৩৮ সালে সুপারম্যানের প্রথম কমিকস বইটি আসে। যা কমিকসকে একটা আস্ত শিল্পখাতে পরিণত করতে বড় ভূমিকা রাখে। প্রথম যুগের কমিকস প্রকাশকরা বলতেন মিরাকলের চাহিদার শেষ হয় নাই, তাই তাদের ব্যবসা হবে মিরাকল কেন্দ্রিক।

সুপার হিরোর ইতিহাস আরো পুরানা। হিটম্যান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান, আয়রনম্যান, কেট উইম্যান, হ্যারিপটার বা নিও- এরা সামনের সারির সুপার হিরো। আরো নানা কিসিমের এলেমদার চরিত্র এর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এদের বেশিরভাগই কমিকস বইয়ের জনপ্রিয় চরিত্র,কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমিকসে থামে নাই। চলচ্চিত্রের পর্দায় ঢুকে পড়েছে। সোজা কথায়, ছেলেমানুষী থেকে বড়মানুষীতে যুক্ত হয়েছে, ফলে একে যৌক্তিক দেখানোর নানা চেষ্টা আছে।

গল্প যাই হোক, ভেতরকার সঙ্গতি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সময় যেহেতু ‘ধর্মের’ নয়, কাজেই অতিমানবীয় শক্তির দোহাই পাড়া হচ্ছে প্রযুক্তির কাধে বন্দুক রেখে। এসব কিছু ব্যাটম্যান বা স্পাইডারম্যানের সর্বশেষ ইন্সটলেশনে আগের চেয়ে আরো বেশি করে ঘটেছে। বিশেষ করে ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যানের সাথে এই সিরিজের  আগের পর্বগুলো মিলিয়ে দেখুন। Continue reading

3 Comments

Filed under সারথি

সুমনের গান / সুধীর চক্রবর্তী

[সুমনের গান বিষয়ে কিছু একটা লেখার ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই ছিলো। কারো কাছ থেকে লেখা না পেয়ে মনে হল নিজেই কিছু লিখি। এজন্য সুমনের গানের উপর কিছু বই খুঁজতে গিয়ে ‘সুমনের গান, সুমনের ভাষ্য’ নামক বইটি চোখে পড়ে। বইটির কথামুখ-এ ‘সুধীর চক্রবর্তী’র লেখাটা এতই ভালো লাগলো যে, ভাবলাম নিজে গুছিয়ে এর থেকে ভালো কিছু মনে হয় লিখতে পারব না, তারচেয়ে বরং এই ‘কথামুখ’টার কিছু অংশই এখানে ছেপে দেই। বইটি হয়ত অনেকেরই পড়া আছে, আর যাঁদের নেই তাঁরা এখান থেকে পড়ে নিতে পারেন। লেখাটি ১৯৯৩ সালের লেখা, সময় অনেক গড়িয়েছি; তাই কিছু কিছু তথ্যবিভ্রাট স্বাভাবিক। যেমন বলা হয়েছে সুমনের ক্যাসেট ৩টা। এটা এখন বেড়ে অনেক দাঁড়িয়েছে। সুমনের গানের কিছু প্রকরনও পরিবর্তন হয়েছে হয়ত। তবুও সুমনের গানের অন্তর্গত মুগ্ধতার রেশটা তো আর হারিয়ে যায়নি   ...  লাল জীপের ডায়েরী ]      

গানের আধুনিকতা আমরা প্রথম পেয়েছি রবীন্দ্রনাথের গানে। ‘ঘাটে বসে আছি আনমনা যেতেছে বহিয়া সুসময়’ এত সংক্ষিপ্ত প্রগাড় গানের সম্পূর্ণতা, মাত্র এক পংক্তির সীমায় বাঁধা, আমরা কখনও শুনিনি। কিংবা ‘চিরসখা ছেড়ো না’-র মতো মিতবাণীর প্রসারিত দ্যোতনা। এ তো গেল বাক বা বাণীর সংহত আধুনিক উৎসারণ। সেই সঙ্গে সুরও কি নয় আধুনিক? ‘ও যে মানে না মানা’ গানে আঁখি পেরানোর বিনতি যে ‘না না না’ উচ্চারণে, তাতে তিন রকমের স্বর বিন্যাস কি আমরা কখনও বাংলা গানে শুনেছি আগে? শুনিনি, তার কারণ  কথার আভা বুঝে সুরের আভাসন, যা খাঁটি কম্পোজারের জাত লক্ষণ, তা রবীন্দ্রনাথ এবং দ্বিজেন্দ্রলালের গানের নির্মানে প্রথম পেয়েছি আমরা। তাঁদের আগে বাংলা গানের প্রবণতা ছিল রাগের ছাঁচে ভাবের ঢালাই করা, তাতে সংগতি থাক কি না-ই থাক। গান বা সুরের কোনো স্থায়ী সংস্কার কি থাকতে পারে আধুনিক মানসতায়? কে বলল মল্লারেই শুধু বাঁধতে হবে বর্ষার গান? মনে নবীন মেঘের সুর লাগলে বর্ষার গানও দ্যুতিময় হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনির্মাণে ‘বাহার’-এ, আর বসন্ত যে শুধুই ফোটা ফুলের মেলা নয়, তা যে ঝরাফুলেরও খেলা সেই অন্তর্গূঢ় অভিনব গানের অনুভব রবীন্দ্রনাথকে জানাতে হয় লোকায়ত সুরে।

দ্বিজেন্দ্রলালের ‘ঐ মহাসিন্ধুর ওপার হতে কী সংগীত ভেসে আসে’ শুনে একজন শ্রোতা নাকি দ্বিজেন্দ্রলালকে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ ‘এটা কোন রাগিণীতে বাঁধা?’ কম্পোজার বলেছিলেন, ‘মহাসিন্ধুর ওপারের রাগিণী’। গানের আধুনিকতা তাই শুধু কথার বিস্ময়কর বিন্যাস বা কবিতার ধর্মকে গানে সংলগ্ন করা নয় বরং তাকে এক সামুহিক কম্পোজিশনে সমঞ্জস করা। সেটা কারা পারেন? যারা একই সঙ্গে গীতিকার-সুরকয়ার-গায়ক। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল থেকে নজরুল ইসলাম পর্যন্ত সকলেই কম্পোজার। গান তাঁদের সব অর্থে স্বায়ত্ত। গানের বাণী, সুর ও গায়ক তাঁদেরই নিজস্ব উদ্ভাবন। কোনো ভাবেই কোনো পরমুখাপেক্ষিতাই নেই। বড় জোর থাকতে পারে নিজের গানকে প্রাসারণের অভিলাষ, প্রচারের ব্যাপকতায় বহুকন্ঠলগ্ন করার আকাঙ্খা। আরেকটা কথা মনে আসবে। এঁরা কেউ জীবিকা বা উপার্জনের জন্য গান তৈরি করেননি। গান ছিল তাঁদের আত্মআস্বাদন বা আত্মপ্রকাশের একটা সূচিমুখ কিংবা আত্ম-আবরণ ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার একটা ভাবময় প্রক্রিয়া। এ ভাবেই চলছিল বাংলা গান। সম্বৃত রুচিমান একদল শ্রোতার পরিপোষণ ও সমাদরে। অন্তরে ঘটছিল লাবণ্যময় মাধুরীক্ষরণ। পটভূমি হঠাৎ পালটে দিল দেশের প্রযুক্তিগত উন্নতি, যন্ত্রায়ন। ১৯৭০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে পর পর গ্রামোফোন ডিস্কের প্রবর্তন, বেতার সম্প্রচার ব্যবস্থার সুচনা ও সবাক চলচ্চিত্রের আবির্ভাব একযোগে দাবি করল নতুন নতুন গান, অনেক গান, বিচিত্রস্বভাবী গান। গান হল নন্দনের সঙ্গে বিনোদনেরও সামগ্রী। শ্রোতার চাহিদা বা ভোক্তার রুচি হয়ে উঠল নতুন গানের নিয়ামক শক্তি। গানেরও নির্ধারণ হল পণ্যমূল্য, বিনিময় যোগ্যতা। আত্ম আস্বাদনের জায়গায় আত্ম বিক্রয়ের ও আপোষের একটা ভবিষ্যৎ আশংকা সেদিন থেকে বাংলা গানের অপনয়নের চিহ্ন এঁকে দিল।

এতদিন গান ছিল মানুষের যাপনাগত দৈনন্দিনের সঙ্গী, তার ব্যবহারিক মুল্য ছিল প্রধান। রেকর্ড-রেডিও-সিনেমার প্রয়োজনে সৃষ্ট গান ব্যবহারিক মুল্যের চেয়ে বিনিময় মুল্যে স্বতন্ত্র হয়ে উঠল। লোকে বুঝল এটা একতা নতুন সামগ্রী। এ গানের গীতিকার একজন, সুরকার আরেকজন এবং শিল্পী সম্পূর্ণ অন্য আরেকজন। অর্থনীতি শাস্ত্রে একেই বলে ‘ডিভিশন অফ লেবর’ বা শ্রমবিভাগ। তাতে কাজের ও উৎপাদনের সংখ্যা বাড়ে, ঝকঝকে কৃৎকৌশলের চমক আসে, কিন্তু গানে সেই শ্রমবিভাগ দক্ষতার চিহ্ন রাখলেও গুণগত উৎকর্ষ বোধহয় বাড়ায় না। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় কমল দাশগুপ্তের সুর এবং তাতে কানন দেবীর কন্ঠ এই ত্র্যহস্পর্শে গানটা বেশ জমতে পারে, না-ও পারে।  না পারলে তাতে কারুর আলাদা দায় নেই। পারলে নতুন কনজ্যুমারদের কাছে গানটা লেগে গেল, প্রচার ও বিপণন বেড়ে গেল, কিন্তু তাতে বাংলা গানের ধারাবাহিকতার কী লাভ হল? এ সব গানে চিরায়ত উপাদান তো তেমন থাকতে পারে না। শ্রোতা বদলায়, রুচির উন্নয়ন-অবনয়ন ঘটে, চাহিদার ধরন পাল্টে যায়, তাই আজকের জনাদরের গান কাল হয়ে যায় লুপ্তপ্রচল। নতুন নতুন শ্রোতার রুচির টানে গানের চেহারা চরিত্র কেবইলই টাল খায়। এটাকেই বলে আধুনিক গান- অন্তত আমাদের দেশে। তাতে গানের আধুনিকতা অনেকটাই নেই, একেবারেই হয়ত ঐতিহ্যছুট কিন্তু আধুনিক মানুষের চাহিদার ওপর ভর করে তার সংখ্যাবৃদ্ধি। এমত চাহিদা থেকে গত এক দশক গীতিকার-সুরকার-শিল্পীর পাশে এসেছেন ‘অ্যারেঞ্জার’। Continue reading

Leave a Comment

Filed under সারথি

কায়মাসুদ: মাসুদ খানের ‘জড় সাধনা’/মৃদুল মাহবুব

কায়মাসুদ

পৃথিবী-গ্রহ। সূর্য-নক্ষত্র। ছায়াপথ-গ্যালাক্সি।

অঙ্কহীন গ্যালাক্সিগতির বিন্যাস।

ঘোড়ার ইলাস্টিক জিনগদির মতো এই বিশ্ব-

এই এতো যে গ্রহ উপগ্রহ নীহারিকা সুপারনোভা-

মাসুদ খান সত্তা নিয়ে অন্য দ্বিতীয় কোন কবিপ্রাণী নেই।

থাকছেন না। যদিও বা কোথাও জায়মান হতে যায়,

অমনি শুরু হয় সংকটের। অবশেষে টিকতে পারে না।

কিন্তু আড়ালের ঘটনা এই যে,

ঋণাত্মক বিশ্বে প্রতিমাসুদ থাকেন

ফ্লেকজিবল পাইপের মতো গলা।

আমার বিপরীতে কবিতা লিখে যাচ্ছে।

স্রোত   / পাখিতীর্থদিনে

মাসুদ খানের অন্যান্য অসাধারণ কবিতাগুলো আমি অনেক পরে আবিস্কার করতে শুরু করি। আমার পাঠ স্মৃতিতে তিনি প্রবেশ করেছেন তার ‘আতাফল’ নিয়ে। অর্থাৎ দ্বিতীয় গ্রন্থ দিয়েই তাকে চিনতে শুরু করি। প্রথম গ্রন্থ তখনও আমার হাতে পৌঁচ্ছায়নি।

মন মরালের পালক গজাতে একটু সময় লেগেছে। পাথর যেভাবে সমুদ্র ঢেউ-এ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়, সেই ভাবে মাসুদ খানের প্রতি আমার আতাফল-জ্ঞান ভাঙতে শুরু করে। নব নব উন্মোচন নিয়ে তার নানা কবিতা আমার স্মৃতি আর বিস্মৃতির ভেতর তীর্থে তবু ফেলতে থাকে। নিজেকে এই আত্ম-ভাঙনে পৌঁছে দিতে আমাকে সমুদ্র জলে নেমে অপেক্ষা করতে হয়েছে নিদারুণ নির্লিপ্ততা নিয়ে; তার পর এক ক্ষরণ কাল, মুগ্ধতায় অবশেষ। আমার কবিতার তরল জ্ঞানে মিশে যেতে থাকে মাসুদ খানের আরও আরও কবিতা। পুনঃপাঠে মূলত আবিস্কৃত হয় প্রতিমাসুদ। ‘অমনি শুরু হয় সংকটের। অবশেষে টিকতে পারে না।’ Continue reading

3 Comments

Filed under সারথি

কবিতার নিকটতম উপলব্ধি : ক্ষুধা ও ব্যথা / জুয়েল মোস্তাফিজ

আগেই ঠিক করে নেয়া যেতে পারে ‘অর্থটা’ আসলে কী? তারপর সেই অর্থের মানদণ্ডে বিচার্য হবে জগতের কী কী   অর্থহীন। মানুষের সবচেয়ে নিকটতম উপলব্ধি হলো ‘ক্ষুধা’ আর ‘ব্যথা’। আর এ উপলব্ধির উৎস সন্ধান করতে গেলে আমরা আসলে কী পাব? হয়তো কিছু পাব হয়তো কিছুই পাব না। যা পাব তাকে আমরা বলছি অর্থপূর্ণ বা অর্থময়তা। কিন্তু যা পাবনা তার নাম কী? যখন রোদ উঠল তখন তার নাম দিলাম দিন। যখন সূর্য ডুবল তখন তার নাম দিলাম রাত। কিন্তু ধরা যাক যখন রোদ কিংবা অন্ধকার কিছুই নেই তখন তার নাম কী? আমরা স্বাভবিক ভাবে  তার নাম দিতে যাই না বা দিতে পারি না। এই রচনার খাতিরে এর নাম দেয়া যাক ‘কবিতা’। আমাদের অনুভূতির সাথে খাপ খাইয়ে যা যা প্রয়োজন অনুভব করি তার অর্থ আমরা  খুঁজে পাই, যা প্রয়োজন অনুভব করি না তার অর্থ খুঁজে না পেয়ে বলি অর্থহীন। কিন্তু পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি অর্থহীন জীব-জগৎ-বস্তু জগতের ওপর যখন আমাদের সন্দেহ, ক্রিয়েশন, গবেষণা, অনুসন্ধান স্থিত হয় তখন কোনো না কোনো অর্থে পরিণত হয়। ‘পাথর’ চিরকাল পাহাড়ের পাদদেশে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে ছিল। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যখন ওই পাথরের ওপর সন্দেহ করে বসে তখন সে পাথর হয়ে ওঠে অর্থপূর্ণ। এখন প্রশ্ন হলো, ওই পাথর তো এতদিন অর্থহীন ছিল। কিন্তু সেই অর্থহীন পাথরে যখন আমরা প্রয়োজন অনুভব করলাম তখনই তা হয়ে উঠল অর্থপূর্ণ। তাহলে অর্থহীন আর অর্থপূর্ণের দ্বন্দ্বে কে বেশি এগিয়ে? এই মর্মে প্রশ্ন তোলা যাক- মানব অন্তরের ভাসমান অস্থির কিছু উপলব্ধির ওপর। অন্তর কি অর্থপূর্ণ? স্থির? দেহ ও মনের বৈচিত্র্য কার ওপর নির্ভরশীল? অর্থ নাকি অর্থহীনতার ওপর? এসবের উত্তর যাই হোক না কেন, মানব অন্তর এক নিরন্তর উপত্যকা। আর কবিতা হলো সেই অন্তরন্তের অবান্তর লিপি। যার অর্থ সে নিজেই জানে না। কবিতার সাথে জীবনেরও আছে এক নিবিড় সাযুজ্য। অর্থশূন্য আর দুর্বোধ্যতার অশেষ ভিত্তিতে আটকে আছে এই দুই সত্তা। কেননা আমাদের কাছে জীবন কখনো অর্থপূর্ণ কখনো অর্থহীন মনে হয়। Continue reading

2 Comments

Filed under সারথি

দলিলে ভাটপাড়া গ্রাম: দগ্ধ হতে হতে যে কবিতাটি লিখেছি / মিঠুন রাকসাম

[ ২০১০ সালে প্রকাশের পর থেকেই " দলিলে ভাটপাড়া গ্রাম '' গ্রন্থটি চোরাগুপ্তা আক্রমন করে চলেছে মনস্ক পাঠকদেরআমরাও বইটি পড়েছিঅবাক হয়েছিদেখেছি কবি ও কবিতার শক্তি কেমন হতে পারেদেখেছি রাগে-কামে-ক্ষোভে উন্মাদ কাব্যভাষা কেমন হতে পারে।  দেখেছি, কবিতায় জীবন কীভাবে,তার সকল কাব্যপ্রসাদ জারী রেখেই রচিত হতে পারেপাখা পেতে পারেআর  হয়ে উঠতে পারে চীরকালীন

মিঠুন রাকসাম, এ গ্রন্থের কবিএকদিন আমরা পেয়ে যাই তাকেআমাদের মুগ্ধতার কথা বলিতাকে বলি, গ্রন্থটি নিয়ে লেখার জন্যেকিছুতেই রাজি হন নাকিন্তু, অনেকটা জোরাজুরি করেই আদায় করা হয় এই  লেখাকেননা আমরা চাচ্ছিলাম, কবির বোঝাপড়ার মুখোমুখি দাঁড়াক পাঠকের উপলব্ধি। আর নতুন একটা পাঠ প্রণোদনা তৈয়ার হোক। যা হয়তো নতুন কোনো ভাবনার খোরাক জোগাবে। 

এখন কথা হচ্ছে, লেখকের নিজের কথা কতটুকোইবা জানা যায়।সেই কথা যত না জানা হলো, তার চে বেশি হয়ত অজানাই থেকে গেলএ কথা তিনি নিজেও লিখে দেন এক ই-মাইলে,   "আমি মনে করি এই ধরনের লেখা একান্ত নিজের! তবু মাঝে মাঝে লিখতে হয় মনে করিআমি নিজেই বুঝতে পারি না কি ছেড়ে কি লিখবো। কেননা যা লিখেছি তা তো পড়েই ফেলেছেন! আপনি ভালো করেই জানেন একটা কাব্যগ্রন্থের পেছনে কত ইতিহাস, কত সুঃখ-দুঃখ লুকিয়ে থাকে তা কি সব বলা যায়! " লেখাটি পেয়ে আমরা ভাবি, থাকুক অজানা অনেক কিছুইযে টুকু জানা হলোÑতাইবা মন্দ কিসে?

আগ্রহী পাঠকগণ"দলিলে ভাটপাড়া গ্রাম"কাব্যগ্রন্থ খানি পড়লে, মনে হয় টাস্কি খাবেনঅবাক হবেনসংযুক্তি হিসাবে, লেখাটির শেষে কাব্যগ্রন্থটির নির্বাচিত কিছু অংশ তোলে দেয়া হলো ]Ñলাল জিপের ডায়েরী

দলিলে ভাটপাড়া গ্রাম: দগ্ধ হতে হতে যে কবিতাটি লিখেছি / মিঠুন রাকসাম

দীর্ঘদিন ধরে কবিতা লেখা নিয়ে মানসিক কষ্টে ভুগছিলামএখনও ভুগিনা তা নয়যা লিখতে চেয়েছি কিংবা চাই তা কি সব লিখতে পারছি না পারি? লিখছি কি সাবলিলভাবে? না নিজের সাথে নিজের ভাবনার সাথে হঠকারিকতা করছি? যা লিখতে চাই তা কি লিখার সাহস রাখি? এভাবে ভাবতে ভাবতে একদিন লিখে ফেলি কয়েক পৃষ্ঠাকিন্তু লিখতে গিয়ে এতো আবেগ তাড়িত হয়ে পড়ি যে লেখা থেমে যায়লেখা আর এগোয় নাContinue reading

Leave a Comment

Filed under সারথি

নোটস ফ্রম ফেসবুক/মজনু শাহ

[মজনু শাহ’র বাক্যগুলো ছোট। কিন্তু তেজিস্ক্রয়তার গুণ সম্পন্ন। পড়ামাত্রই অর্থময় হয়ে উঠে। প্রকাশ করে কবির যাপন ও সাহিত্যিক চিন্তা। আর এ ভাবেই মজনু ভাইয়ের কবি-জগৎ কে বোঝার জন্যেই অনেক দিন ধরে, আমরা নজর রাখছিলাম, তাঁর ফেসবুকের নোটে কিম্বা সাহিত্যিক তর্ক-বিতর্কে। আর অবাক হচ্ছিলাম। কেননা তার কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল, আমাদের কাছে। কবি, পাঠক কি সাহিত্যিক, সবার জন্যেই। সে দরকারের কথা মনে রেখেই, মজনু ভাইয়ের কাছে আমরা তার নির্বাচিত কিছু তর্ক-বিতর্কের অংশ বা নোট চেয়েছিলাম। মজনু ভাই ফেরাননি আমাদের, কিছু যোগ-বিয়োগ শেষে, পাঠিয়েছেন। আর আমরাও , প্রিয় লাল জিপের ডায়েরীর পাঠক, আপনাদের জন্যে নিবেদন করলাম। অসাধারণ অনেকগুলো গদ্য। লেখাটির শেষে, সংযুক্তি হিসাবে মজনু শাহ’ এর একটি সাক্ষাৎকার ও তার গ্রন্থ ‘ জেব্রামাস্টার’ এর উপর একটি গদ্যের লিংক দেয়া হলো।]

 

 

 

 

 

 

 

 

  নোটস ফ্রম ফেসবুক/মজনু শাহ

১।

নৈর্ব্যক্তিক বা আত্মজৈবনিক, যা-ই হোক, রচনার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ভাবি আমি। কবিতা বা কোনো একটা আখ্যান, তার নির্মিতি, তার ভেতরে বলা সমস্ত কথার প্রতি যদি পাঠকের অবিশ্বাস জন্মায়, যদি ভাবেন যে এ তো বানানো, খড়ের পুতুল, তবেই গেল।

হাত থেকে তখন বই খসে পড়ে। Continue reading

Leave a Comment

Filed under সারথি

উপন্যাস-পাঠকের প্রতি নিবেদন / হামীম কামরুল হক

জীবনকে আবেগে উৎসাহে ও উদ্দীপনায় নিত্যদিন একই রকমভাবে ধরে রাখাটা খুব সোজা ব্যাপার নয়। অথচ মানুষ মূলত আনন্দকামী। এই আনন্দ পেতে চাওয়াটাও তার নানা রকমের ব্যথাবেদনার একটা উৎস। তারপরও জীবনের সঙ্গে তাকে যুক্ত থাকতে হয়। যে সব মানুষ প্রতিনিয়ত তার নানা রক্তক্ষরণের কারণ তাঁদের সঙ্গে তাকে বসবাস করতে হয়। মানুষের সঙ্গে সংযোগহীন হয়ে মানুষ তো বাঁচতে পারে না। সে রকমেরই একটা সংযোগ তৈরি হয় উপন্যাসের মাধ্যমে, এটা একটা নান্দনিক সংযোগ, যা তাকে জীবনকে আগের চেয়ে একটু ভালো করে বুঝে নিতে সহয়তা করতে পারে। একটি প্রকৃত উপন্যাস পাঠের পর কোনো পাঠকই আর আগের জায়গায় থাকেন না। যেকোনো শিল্পর মতো এখানেও এ ঘটনাটি ঘটে- এবং তা এমন ভাবেই ঘটে পাঠক সেটি টেরও পান না। অনেকটা রোগিকে বুঝতেই না দেওয়া যে তার চিকিৎসা চলছে, উপন্যাস সেভাবেই ব্যক্তি মানুষের ও মানবসমাজের গভীর গহন ক্ষতের ওপর নতুন প্রাণের ও উদ্দীপনার প্রলেপ বোলায়।
ফলে উপন্যাস-পাঠ মানেই একটা অদৃশ্য নিরাময়ের ঘটনা ঘটা। ভ্যান গগ ‘উপন্যাসের পাঠক’ নামের  যে ছবিটি এঁকেছিলেন তাতে একজন নারী সোফায় বসে হলুদ রঙের মলাটের একটা বই পড়ছে। এবং এর পটভূমিটাও মূলত হলুদ। হলুদ কী আনন্দের রং? তাহলে উপন্যাস পাঠ মাত্রই একটা আনন্দের আবহ পাঠককে ঘিরে ফেলে? না বিষাদের রং হলুদ? স্থান-কাল-পাত্র ফেরে রঙের ওই আবেদন বলে আলাদা। সে যাই হোক, উপন্যাসের রঙ ও তাঁর পরিপার্শ্বের রঙ এক হয়ে গেছে এ ছবিতে। তাঁর পেছন দিকে উঠে গেছে একটা সিঁড়ি। এই সিঁড়িটাও ‘ওপরে ওঠার’ ইংগিত দেয় নাকি? সে নিজে পরে আছে কালচে রঙের পোশাক। বোধ করি কালো যে রহস্য ও জ্ঞানের রঙ তাও কি এখানে লক্ষণীয়। এবং সর্বোপরি মনে হবে একজন নারীকে কেন দেখানো হল উপন্যাসের পাঠক হিসেবে? এর একটা উপপ্রমেয়মূলক জবাব দেওয়া যায়: উপন্যাসমূলত নারীবাদী না হলেও নারীকেন্দ্রক ব্যাপার ওই মহাকাব্যের মতোও তলে তলে কি প্রকাশ্যভাবে এতে কাজ করে যায়। ‘রামায়ণে’র সীতা হরণ নিয়ে তৈরি হয় এর মূল সংকট। ‘মহাভারতে’ দ্রৌপদীর অপমান কুরু-পাণ্ডবের বিদ্বেষকে তীব্রতা দেয়। ‘ইলিয়াডে’র হেলেন নিয়ে লড়াই আর ‘অডিসি’তে পেনিলোপের অপেক্ষা- সবর্ত্রই নারী হয়ে আছে এর প্রধানতম প্রতিপাদ্য। পুরুষের কাজ হয়েছে কেবল তার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী বেশ কয়েকটি উপন্যাসের কেন্দ্র দেখব নারীকেই। এটা কেন ঘটে? কারণ কোনো সমাজের অবস্থা বুঝে নেওয়ার একটা উপায় হল সেই সমাজের নারীরা কেমন পরিস্থিতির মধ্যে আছে সেটা দেখিয়ে দেওয়া। একজন নারীর অবস্থান তাই যেকোনো পরিস্থিতিতে মানব অস্তিত্বের স্মারক। মানবিকতাকে চিনে নেওয়ার উপায়ও। এবং বলতে দ্বিধা নেই, নারীকে আধুনিক করে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশে সেদেশের উপন্যাস পাঠ বড় রকমেরই ভূমিকা রেখেছে। Continue reading

Leave a Comment

Filed under সারথি

বিষয়ঃ ইলিয়াসের খোঁয়ারি

[ইলিয়াসের খোঁয়ারি’র নাম আমরা জেনে ফেলেছিলাম, দেখার আগেই। ফলে একটা অদ্ভুত ও অসাধারণ কোনো কিছুর প্রত্যাশা তৈরী হয়েছিলো, ভিতরে ভিতরে। পূর্ব অভিজ্ঞতা হতে জানি, এই প্রত্যাশা অনেক সময়, মাঠে মারা যায়। বা শিল্পের প্রকৃত মূল্যায়নে ঝামেলা তৈয়ার করে।  সেই সব কথা স্মরণে থাকার পরেও, একটা ঝুঁকি নিয়েছিলাম আমরা। সেই বছর দুয়েক আগে। না, সেই ঝুঁকি আমাদের বেকায়দায় ফেলেনি। বরং হয়ে ওঠা একটা ডকুফিল্ম আমাদের মুগ্ধ করেছিল। অবাক-ও হয়েছিলাম আমরা। আমরা বুঝে নিয়ে ছিলাম, এই মেকারের সাহস, আর কব্জি বা মেধার জোড় । হ্যাঁ এই বুক চেতানো মেকারের নাম শিবু কুমার শীল। যিনি, খোঁয়ারি নামক ডকুফিল্মের মাধ্যমে,  ইলিয়াসকে ডিল করেছেন। একই সাথে, ইলিয়াসের গল্পের কল-কব্জা ধরার জন্যে, গেরিলা অভিযান চালিয়েছেন, বাস্তবের বিখ্যাত মানুষ রণজিৎ কুমার পাল চৌধুরীর সাথে। এবং বাস্তব রণপা কীভাবে গল্পে সমরজিৎ নামে, বর্ণীত হোন, তাও ধরার চেষ্টা করেছেন। শুধু তাই নয়, এরি সাথে সাথে তিনি, খোঁয়ারি তে, তোলে এনেছেন মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধত্তর বাংলাদেশ ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ-রণপার জবানিতে । 

আমরা শিবু কুমার শীল এর কাছে, তার এই অসাধারণ কাজটি নিয়ে, একটা লেখা চেয়েছিলাম। সেই গদ্যটি আজ প্রকাশিত হলো। সাথে, অস্ট্রিক আর্যু'র একটি ভয়ানক গদ্য, খোঁয়ারি’র ওপর। আর এই গদ্য দুটি একই সাথে থাকায়, আমরা আশা করি, পাঠক সহজেই, একজন মনস্ক দর্শকের চিন্তার সাথে, ফিল্মমেকার এর নিজের মত ও চিন্তার মিল-অমিল টুকু, বুঝে নিতে পারবে।

আজ  লেখা দুটি প্রিয় পাঠক, আপনার জন্যে, নিবেদিত হইলো। তার আগে, জানিয়ে রাখি, ‘ইলিয়াসের খোঁয়ারি’ডকুফিল্মটি, পরিচালনার সাথে সাথে, এর স্ক্রিপ্ট-ও লিখেছেন শিবু কুমার শীল। এবং এই ডকুফিল্মটি, সেলিব্রেটিং লাইফ ২০০৮ এ বেস্ট ডকুমেন্টারি ও বাংলাদেশ প্রামান্যচিত্র উৎসব ২০০৯ এ শ্রেষ্ঠ তরুণ প্রামান্যচিত্র নির্মাতার পুরষ্কার পায়।]

[রণজিত পাল চৌধুরীঃ 'ইলিয়াসের খোঁয়ারি’র প্রধান চরিত্র, যাকে কেন্দ্র করেই, এগিয়ে যায় এই ডকুফিল্মটি ] Continue reading

1 Comment

Filed under সারথি