জেনেসিস ২০০০ / এম. এস. রানা ও রাসেল আজাদ

[গানসংখ্যা-১/রিপ্রিন্ট]

gan[বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের যাত্রাপুস্তক থেকে কয়েকটা চ্যাপ্টার এই ফিচার-আর্টিক্যলের উপজীব্য। রচনাটা ছাপা হয়েছিল ২০০০ খ্রিস্টাব্দের আনন্দভুবন  ঈদসংখ্যায়। বর্ষ ৪ সংখ্যা ১৬, ০১ জানুয়ারি ২০০০। অধুনালুপ্ত শোবিজ-নিউজ-ভিউজপ্রচারক এই পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন কায়সুল হক; বেক্সিমকো মিডিয়া লিমিটেডের পয়সায় এইটা ছাপা হতো বাংলাদেশের ক্যাপিট্যল ঢাকা থেকে। বেক্সিমকো গ্রুপের তখন পুঁজিকীর্তিকলাপ রমরমা, বাংলাদেশের ব্যাঙ্কিং সেক্টরে প্রায় বারোটা বাজানোর আগ পর্যন্ত অতিকায় ঋণখেলাপি অর্থগৃধ্নু এই গ্রুপের মিনিমাম পাঁচটা-সাতটা কাগজ ছিল বাজারে, এর মধ্যে একটা বার্ধক্যঝোঁকা সাহিত্যসেবায় নিবেদিতপ্রাণ শৈলী  এবং একটা এই বিনোদনপাক্ষিক আনন্দভুবন, ছিল আরও দৈনিক-ফ্যাশনাইকোনিক-স্পোর্টস মিলিয়ে ভ্যানতারা নানা কাগজ ঝলমলে লেবাসের। হেন বিজনেস তখন কমই ছিল ভূবাংলায় যা বেক্সিমকো গ্রুপের প্রিপে/গ্রাসে গরহাজির। কাদামাটি থেকে চিনামাটি, ভ্রুণরোধক বেলুন, মৃতসঞ্জীবনী মলম বেচার বিচিত্র ব্যবসা তাদিগের করপুটে ধরা ছিল। ধরা খাবার বাদে একে একে মিডিয়াব্যবসা তথা পত্রিকা তামাদি হয়ে যেতে থাকে; শেষমেশ শেয়ারচুরির হিস্যা সাবড়ানোর পর মহাডাকাতিতে সাময়িক ইস্তফা দিয়ে এখন জ্বরের বড়ি বিক্রিবাট্টায় মার্জিন অবশ্য মন্দ থাকে না। যা-হোক, আনন্দভুবন  পত্রিকাটা সার্ভ করেছে এক-সময় বাংলা কাল্চারের বেশকিছু জমিজিরেতের ক্ষেতখামার উন্নয়নে। এরা সারেগারে  নামে একটা আলাদা পার্ট প্রবর্তন করেছিল পত্রিকাভ্যন্তরে স্পেশ্যালি ডেডিকেইটেড টু বাংলা মিউজিক অ্যান্ড মিউজিশিয়্যান্স। পত্রিকা উইদিন পত্রিকা, দারুণ, বলা বাহুল্য। ঘটনাটা আজও স্মরণীয়; অদ্যাবধি দ্বিতীয় নজির, আনন্দভুবনতুল্য প্রোফেশন্যাল বিনোদনম্যাগ, লোকসমক্ষে অ্যাবসেন্ট। তো, ওই পত্রিকায় বেরিয়েছিল ‘জেনেসিস ২০০০’ শীর্ষক ফিচারটা, ব্যান্ডের অত্যন্ত জনপ্রিয় ডজনখানেক গানের আঁতুড়কথন ও ভূমিষ্টক্ষণ নিয়া আদ্যোপান্ত রচনাটার মূল অনুসন্ধিত্সা। গানমহাজনেরাই নিজেদের একটা করে গানের জন্মেতিহাস ও বিকাশ বর্ণনা করেছেন। গোছগাছ করে লেখাটা ছাপা হয়েছিল সংশ্লিষ্ট গানের গিটারকর্ড সমেত গোটা গানটার লিরিক্স। অথার্ড বাই এম.এস. রানা অ্যান্ড রাসেল আজাদ। সেই লেখাটাই রিস্টোর করা হলো অবিকল এইখানে, কেবল গিটারকর্ড দেয়াটা হ্যাপা বিবেচনায় এক্সক্লুড করা গেল। অদ্যকল্য ইউটিউবে গানগুলো শোনা যায়, লিরিক্স কর্ডসমেত রিটেন ফর্মেও সুলভ, এবং কর্ণে শুনিয়া সাউন্ড-কর্ড-নোট সমস্তই রিকন্সট্রাক্ট করা আদৌ কঠিন কিছু তো না। কাজেই ফিচারটার লেখারূপের বলা যায় এইটা পরিবর্তিত প্রকাশমাধ্যমে পুনর্প্রিমিয়ার।

এইটা দরকার। ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে ব্যান্ডসংগীতের যা-কিছু তথ্যোপাত্ত সমস্তই প্রিজার্ভ করা দরকার, নাগালসীমায় রাখা আবশ্যক সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর, কাজেই মুদ্রিত কাগুজে প্রকাশনা এক্ষেত্রে একটা আকর। অবশ্য ব্লগে বা ব্যক্তিগত প্রয়াসে এই কাজ হচ্ছেও যথেষ্ট। তবু পূর্ণায়ত কোনো উদ্যোগ গোচরীভূত হয় না। যা-কিছু সমস্ততেই এলোমেলোপনা। তা-ও যদি পাওয়া যাইত লোকালয়ে লেখাপত্তরগুলো অ্যাভেইলেবল, তো কথা ছিল না। আমরা কেবল ইনফো হিশেবে এইটুকু জানি যে ব্যান্ডসংগীতের গোল্ডেন টাইমের গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী রীতিমতো পরিশ্রমসাধ্য গবেষণা করেছেন একটা, বাংলাদেশে ব্যান্ডসংগীত আন্দোলন  সম্ভবত শিবলীপ্রণীত বইটার নাম, বেরিয়েছে মেলা-ও-বিবিধ-খেলাধুলা আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা অ্যাকাডেমি  থেকে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে মহাকালে মাল সাপ্লাই হয় বলিয়া মাঝেমধ্যে দৈববাণী শোনা যায়, কিন্তু সরবরাহকৃত মাল সমকাল জাম্প দিয়া যায়টা কোথায় তা কাউকেই জিজ্ঞাসিয়া জানার উপায় নাই। জিনিশটা তাহলে প্রেম, স্বর্গে উদয় এবং স্বর্গেই বিলয়, আমাদের ন্যায় হার্মাদের তাহা দেখিবার জো নাই, হাতাইবার প্রশ্ন তো উবিয়া যায় উঠিয়াই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটার পাত্রমিত্র পোলিটিক্যালি নিরীহ ও গোবেচারা, প্রান্তরে উদাসীন কৃষ্ণের জীব সমতুল, সুখ্যাত তারা সুললিত সৎ ও সজ্জন বলিয়া। আর পিতৃঅন্তপ্রাণ, কন্যাবত্সল। তাদিগের প্রত্যেকের রয়েছে একেকটা বাগানবাড়ি এবং বাগানবাড়িতে রয়েছে একাশি খণ্ড অভিধান ও উন্নত জাতের ভূষি, খৈল ও ঘাস। তাহাদের তরে ক্যামেরাফোক্যাস্ ও উত্সব বারোমাস।

রচনাটা জানাচ্ছে যে একই পত্রিকায় এর অব্যবহিত আগের বছর ১৯৯৯ ঈদসংখ্যায় জেনেসিস  অ্যাসাইনমেন্টে একডজন অধিক গানজন্মেতিহাস ছাপানো হয়েছিল। ওই প্রোজেক্টের পোস্ট-সাক্সেস এক্সটেনশন এই রিপোর্ট-ফিচার। কাজেই নিরানব্বইয়ের আনন্দভুবন  ঈদসংখ্যা ঘেঁটে আরও বারোটা গানের বার্থ সেলিব্রেইট করা যায়, সেইটা প্রাপ্যতা সাপেক্ষে। এখানে আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ্য যে এইগুলো ঠিক ব্যান্ডসংগীতের একেবারে গোড়ার দিককার গান নয় কেবল আজম খানেরটা ছাড়া। বলা যায় ব্যান্ডহিস্ট্রির গোল্ডেন পিরিয়ড তথা তার মধ্য-পর্যায়ের গান এইগুলো। ২০০০ সালে ফিচারটা ছাপা হবার পরবর্তী কিছু বছরের মধ্যে ব্যান্ড অ্যাক্টিভিটি স্তিমিত ও নিস্তেজ হয়ে যেতে দেখব আমরা আস্তেধীরে। ক্যাবলটিভির যুগ শুরু হবে। ময়দানে কন্স্যার্ট আয়োজন প্রায় নিষিদ্ধের পর্যায়েই চলে যেতে দেখব আমরা। ব্যান্ড অ্যাক্টিভিস্টরা সবাই এইসব তত্পরতা বুঝিয়াও টুঁ-শব্দ করবেন না বলেই আমাদের গোচরে আসবে। টেলিভিশনস্টুডিওর ফেইক অ্যাটমোস্ফিয়ারে অ্যাঙ্কর আর্টিফিশিয়্যাল সুহাসিনীর সনে নাইটলং ফ্লার্ট করে যেতে দেখব আমরা আমাদের এককালের ব্যান্ডবিদ্রোহীদেরে। দেখব বায়বীয় শ্রোতাদর্শকের উদ্দেশ্যে ভুতুড়ে জেশ্চার আর বায়বীয় দরদী মরমিপনা তাদের। ব্যান্ডসিঙ্গারদের বাড়িতে বাড়িতে গজাবে স্টুডিও। ফল হাতেনাতে পাবার পরিবর্তে অথর্ব ও অফলা হতে দেখা যায় এই-সময়টাতেই আমাদের ব্যান্ডের মায়েস্ত্রো মিউজিশিয়্যানদের। জিঙ্গেল বানানো ছিল আগে থেকেই, এবারে যুক্ত হলো টিভিসি-টিভিফিকশন ইত্যাদির আবহসৃজনের ব্যস্ততা, আর মহামারীর ন্যায় অভিনয়। অ্যাক্টিং হয়ে উঠল গোটা জাতির সর্বশীর্ষ গর্ব। কবি থেকে শুরু করে কামার-কুমার-জেলে-তাঁতি মিলে সক্কলে অ্যাক্টিং শুরু করল স্ব স্ব ধর্মকর্ম জলাঞ্জলি দিয়ে। ব্যান্ডমিউজিক এই অ্যাক্টিং-ডমিনেইটেড ওয়েইভের তোড়ে তলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। এছাড়া প্রোডাকশন হাউস, ফ্যাশন ও ব্যুটিক হাউস প্রভৃতি খুলিয়া বসিয়া দুইটা পয়সাকামানো তো দরকারও ছিল। ফোক্যাসড থাকল না কেউই নিজের ধ্যানে। স্টিক করে থাকাটা গেল উঠে। গেল ডুবে ব্যান্ড। এখন যৌবন যার, মিউজিক ভিডিও বানাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। এইটুকু অল্পকথার গল্প, আপাতত। রচনাটার প্রতিবেদকদ্বয়ের হালফিল বিশদ পরিচয় জানা যায়নি, বিশেষ দ্রষ্টব্য ও আক্ষেপের এইটুকুই।]

ভুমিকা গদ্য :: জাহেদ আহমেদ

...

গত বছরের ঈদ সংখ্যার অন্যতম জনপ্রিয় আইটেম ছিল জেনেসিস। পাঠকরা বারবার অনুরোধ জানিয়েছেন জেনেসিস ধারাবাহিক করার। কিন্তু নানান কারণে তা সম্ভব হয়নি। সে-অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই এবার ঈদ সংখ্যায় ছাপা হলো জেনেসিস ২০০০। এবারও ১২টি গান, সাথে বাড়তি পাওনা গানগুলোর কর্ড। এবারও গানগুলো সাজানো হয়েছে ব্যান্ডের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী।

 

ওরে আমার পাগল মন :: আর্ক

আর্কওরে আমার পাগল মন / চিন্তাভাবনা কইরা তুমি / দিও তোমার মন / আপন আপন করিস যারে / সে-তো আপন নয় / ওরে আমার পাগল মন।। # এদিক-ওদিক চাইলে তুই দেখবি কতজন / ঘর হারাইয়া পথ চইলা দেখবি এ-ভুবন / আসল মন পাইতে হইলে / সাধন প্রয়োজন।। # ভবেরই এ-মায়াজালে মন পুড়াইয়া হায় / সোনা হইলে পরে তারে সবাই পাইতে চায় / এক জীবনের জগৎটারে / জীবন দিয়ে ভালোবেসে / আসল মন পাইবি তুই ঐ জগতে হয় / ওরে আমার পাগল মন।।

[কথা ও সুর : রিদওয়ান চৌধুরী পঞ্চম ।। ব্যান্ড : আর্ক]

এই গানটির সৃষ্টিরহস্যটা কিন্তু চমৎকার। আর্ক-এর কেউই ভাবেননি যে এই গানটিই তারা করবেন এবং গানটিই হয়ে যাবে তাদের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম। কেননা এই গানটির শুরুটা করেছিল অন্তরালের এক মানুষ। আর অজ্ঞাত সেই অন্তরালের মানুষটিই হয়তো কখনো কল্পনাও করেনি যে তার মুখ থেকে গুনগুনিয়ে বেরিয়ে আসা গানটিই এক-সময় সব মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। আর্ক-এর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য বেজিস্ট পঞ্চমের বোন সামিনা চৌধুরী। সামিনার বাসাতে যে কাজের মহিলাটি ঘর ঝাড়ু দেয়ার কাজ করতেন, তিনিই কখনো ঘর ঝাড়ু দেয়ার সময় কিংবা কখনো-বা ঘর মোছার ফাঁকে, কখনো-বা অন্য কোনো কাজের অবসরে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠতেন ‘ওরে আমার পাগল মন / চিন্তাভাবনা কইরা তুমি দিও তোমার মন’। সেই বাসাতেই পঞ্চম একদিন কাজের বুয়ার গুনগুনিয়ে-গাওয়া গানের মুখটা শুনে ফেলেন। শুনেই কথাটা ভালো লেগে যায়। তাই মহিলার গাওয়াটা গিটারের কর্ড ধরে একদিন কম্পোজ করে ফেলেন। যাক, শুরু যখন হলো শেষ তো হবেই। কাজে লেগে গেলেন পঞ্চম। সামিনার স্বামী স্বপন চৌধুরীর সহযোগিতায় গানের প্রথম অন্তরা ‘এদিক-ওদিক চাইলে তুই / দেখবি কত জন … সাধন প্রয়োজন’ পর্যন্ত লিখে সুরও করে ফেললেন। অতঃপর গানের বাকি অংশ ‘ভবেরই এ মায়াজালে …’ পঞ্চম নিজেই লিখলেন। হয়ে গেল সম্পূর্ণ গান। অবশেষে কম্পোজিং করে আশিকুজ্জামান টুলু-র কণ্ঠে রেকর্ডিং করা হলো স্টুডিওতে। সবশেষে তাজমহল  অ্যালবামে ফিতাবন্দি করে উপহার দেওয়া হলো শ্রোতাকে। শ্রোতাও ভিন্ন আমেজের এই গানটি গ্রহণ করল বিস্ময়াভিভূত হয়ে, তাই আর্কের হিট গানগুলোর মধ্যে এই গানটি হয়ে যায় অন্যতম একটি গান যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে, কেউবা আবার নিজের অজান্তেই কখনো কখনো গেয়ে ওঠেন ‘ওরে আমার পাগল মন …’ আর অজ্ঞাতই থেকে যায় সেই কাজের বুয়াটি।

শ্রাবণের মেঘগুলো :: ডিফরেন্ট টাচ

ডিফরেন্ট টাচশ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে / অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণী ঝরায়ে / আজ কেন মন উদাসী হয়ে / দূর অজানায় চায় হারাতে।। # কবিতার বই সবে খুলেছি / হিমেল হাওয়ায় মন ভিজেছে / জানালার পাশে চাপা-মাধবী / বাগানবিলাসী-হেনা দুলেছে।। # মেঘেদের যুদ্ধ শুনেছি / সিক্ত আকাশ কেঁদে চলেছে / থেমেছে হাঁসের জলকেলি / পথিকের পায়ে-হাঁটা থেমেছে।। # আজ কেন মন উদাসী হয়ে / দূর অজানায় চায় হারাতে।।

[কথা ও সুর : আশরাফ বাবু ।। ব্যান্ড : ডিফরেন্ট টাচ]

‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি ডিফরেন্ট টাচ-এর একটি তুমুল জনপ্রিয় গান। সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রেখে এগিয়ে-চলা এই গানটি এখনো যে-কোনো ঝিমিয়ে-পড়া অসাড়কেও মুহূর্তের মধ্যে চাঙ্গা করে তোলে। কিন্তু এমন মুহূর্তের মধ্যেই কি জন্ম হয়েছিল ‘শ্রাবণের মেঘ’ গানটি? খানিকটা হ্যাঁ, খানিকটা না — জানালেন গানটির সুরকার-গীতিকার আশরাফ বাবু। সময়টা ছিল ১৯৮৭ সাল এবং বাংলা শ্রাবণ মাস। প্রায় তিন-চারদিন যাবৎ এক-নাগাড়ে বৃষ্টি পড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা হচ্ছিল ব্যাহত। সকালে ডিফরেন্ট টাচ  চলে যাবে ঢাকায়। তাদের সব-ধরনের প্রস্তুতিই মোটামুটিভাবে শেষ হয়েছে। প্রথম অ্যালবামের গান রেকর্ডিঙের জন্য একটি গান ছাড়া বাকি সব গান মোটামুটিভাবে প্রস্তুত। কিন্তু একটি গান এখনো বাকি এবং এই গানটা দেওয়ার কথা আমার। কিন্তু মনের মতো কোনো গান করতে পারছি না। ঠিক যেমনটি চাচ্ছি তেমনটি যেন হচ্ছে না। এভাবে চলল সারারাত ধরে প্রায় নিস্ফল প্রচেষ্টা। অতঃপর শেষরাতের দিকে জানালার পাশে বসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা দেখতে দেখতে লিখে ফেললাম ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’।  এভাবেই এগিয়ে চলল লেখা। ভোররাতের দিকে যখন পুরো গানটা শেষ করে উঠলাম তখন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কাহিনির সমাপ্তি টানলেন পিয়াল, বললেন — আমরা আমাদের ব্যান্ডের জন্য এমন একটা গান চাচ্ছিলাম যেটাকে আমরা হাইলাইট করব এবং আশরাফ বাবু আমাদের ঠিক সেই ধরনের একটা গানই দিতে পেরেছেন। ‘৮৭ সালে ডন স্টুডিওতে রেকর্ড করে যখন আমাদের প্রথম অ্যালবামের মধ্য দিয়ে রিলিজ হয় সেই তখন থেকেই কিন্তু গানটির এমন জনপ্রিয়তা।

মৌসুমী [প্রথম পর্ব] :: ফিডব্যাক

ফিডব্যাকফিরে এসো এই অন্তরে / ফিরে এসো এই বন্দরের পথ ধরে / তুলনাহীনা বান্ধবী / যেওনাকো তুমি ওই দূরে / ব্যথা জাগে এই মন জুড়ে / হতে চাই ফিরে তোমার গীতিকবি / মৌসুমী, কারে ভালোবাসো তুমি / মৌসুমী, বলো কারে খোঁজো তুমি / মৌসুমী, আছি একা এই আমি / ভুলে অভিমান হও সঙ্গিনী।। # তুমি আছো প্রাণস্পন্দনে / তুমি আছো হাসি-ক্রন্দনে, বন্ধনে / অপরাজিতা নন্দিনী / চেয়ে দ্যাখো তুমি ওই চোখে / মিশে আছো সুখ আর দুঃখে / এঁকে যাই তোমার মুখছবি।। 

[কথা : কাওসার আহমেদ চৌধুরী ।। সুর ও সংগীত : ফিডব্যাক ।। ব্যান্ড : ফিডব্যাক]

১৯৮৭ সালের কথা। ফিডব্যাকের সদস্যদের পরিচিত ক-জন বন্ধুর মধ্যে এক প্রেমকাহিনির প্লট তৈরি হয়। ত্রিভূজ প্রেমের এ-গল্প শুরু হয় একটি মেয়েকে ঘিরে। এমনকি ফিডব্যাকের মেম্বারদের ঘরোয়া আড্ডাতেও ওই মেয়েটিকে নিয়ে নানা রকম কথা হতো। আর এই ঘটনাটি নিয়েই ফিডব্যাকের আরেক পরিচিত কথক কাওসার আহমেদ চৌধুরী লিখে ফেললেন ‘মৌসুমী’ গানটি। মেয়েটির নাম অবশ্য মৌসুমী ছিল না। তার আসল নাম জানাতেও রাজি হননি ফিডব্যাকলিডার ফুয়াদ নাসের বাবু। গানটি লেখার সময় ‘কারে ভালোবাসো তুমি’ — এ-লাইনের সাথে ছন্দে মেলানোর জন্যই মৌসুমী নামটি রূপক হিশেবে রাখা হয়েছে। মেয়েটির আসল নামটি গানের ছন্দে মেলানো সম্ভব হয়নি। ফিডব্যাক  যখন তাদের অ্যালবাম বের করার পরিকল্পনা করে, ঠিক তখন গীতিকার এই থিম নিয়ে ‘মৌসুমী’ লেখেন। ‘মৌসুমী’ গানটির কম্পোজিশন দিয়েই শুরু করা হয় অ্যালবামের কাজ। গানটি রেকর্ডিং করা হয়েছিল এলভিস স্টুডিওতে।

আমায় ডেকো না :: হ্যাপিটাচ

লাকি আখন্দআমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না / ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না / বিবাগী এ-মন নিয়ে জনম আমার / যায় না বাঁধা আমাকে / কোনো পিছুটানের মায়ায়।। শেষ হোক এই খেলা এবারের মতো / মিনতি করি আমাকে / হাসিমুখে বিদায় জানাও।।

[কথা : কাওসার আহমেদ চৌধুরী ।। সুর : লাকি আখন্দ ।। ব্যান্ড : হ্যাপিটাচ]

লাকি আখন্দের একটি জনপ্রিয় গান ‘আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না’। মনের মানুষটির প্রতি কষ্টময় এক অভিমান জড়ানো এই গানটি আজও যে-কোনো আসরে বা আড্ডায় সমান জনপ্রিয়। আজ এতগুলো বছর পরে শ্রোতার হৃদয়ে গানটির আবেদন এতটুকুও ম্লান হয়নি। ‘আমায় ডেকো না’ গানটির গোড়াপত্তন ঘটেছিল বিশ্ববিখ্যাত সেই এলবিমো  মিউজিকটা থেকে। ‘এলবিমো  মিউজিকটা খুব ভালো লাগত আমার কাছে’, — লাকি বললেন, — ‘সেই ৭৬-৭৭ সালের কথা, মিউজিকটা আমি খুব শুনতাম আর মনে মনে চিন্তা করতাম ওরা যদি পারে এ-ধরনের একটা মেলোডিয়াস মিউজিক তৈরি করতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না।’ ঠিক তখনকার সেই দিনগুলো ছিল লাকির জীবনের একটা বিশেষ সময়। বেশ কয়েকটা কারণে তিনি একরাশ অভিমান বুকে নিয়ে সরে এসেছিলেন তার মনের মানুষের কাছ থেকে। শেষ করতে চাইছিলেন এই নিষ্ঠুর প্রেমের খেলার। থাক-না ভেতরের কষ্টটা ভেতরেই চাপা পড়ে, তাই অনেকটা হাসিমুখেই তিনি বিদায় নিতে চাইলেন প্রিয় সেই মানুষটির কাছ থেকে। এমনই এক অসহনীয় সময়ে লাকি এলবিমোর সেই মেলোডি অনুসরণ করে সুর করলেন ‘আমায় ডেকো না’ গানটির। এরপরেই গানের কথার জন্য শরণাপন্ন হলেন গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীর। দু-জনেই ছিলেন দু-জনার খুব ঘনিষ্ঠ, তাই লাকির সেই দুঃসহ প্রেমের বিমূর্ত ভাবাবেগ বোধহয় কাওসার আহমেদ চৌধুরীর মাঝেও সঞ্চারিত হয়েছিল। আর সেজন্যেই বুঝি তিনি লাকির সাথে মিল রেখে এ-ধরনের চমৎকার একটা গান লিখে ফেলেন। একটা নাটকে প্রথম এই গানটি প্রচারিত হয় এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসে। অবশেষে অ্যালবামের ফিতাবন্দি হয়ে ভক্তদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় ‘৮৫ সালে। ‘৮৬ সালে বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠেও গানটি আরো একবার শোনা যায়। গানটি রেকর্ডিং করা হয়েছিল এলভিস স্টুডিওতে।

ফেরারী মন :: এলআরবি

এলআরবিফেরারী এ মনটা আমার / মানে না কোনো বাধা / তোমাকে পাওয়ারই আশায় / ফিরে আসে বারেবার / কখনো ভাবিনি আমি / ব্যথা দিয়ে তুমি চলে যাবে।। # কি-যেন-কি ভুল ছিল আমার / আমাকে কেন গেলে কাঁদিয়ে / তাই আমি ফিরে আসি বারেবার।। # যে-পথে হারিয়েছি তোমায় / সেই পথে খুঁজে আমি যাব / অভিমান করে থেকো না / অপবাদ দিয়ে যেও না / তাই আমি ফিরে আসি বারেবার।।

[কথা ও সুর : আইয়ুব বাচ্চু ।। ব্যান্ড : এলআরবি]

অসংখ্য জনপ্রিয় এবং হিট গান রয়েছে ব্যান্ডগ্রুপ এলআরবি-র ভাণ্ডারে। তার মধ্যে ‘ফেরারী এ মনটা আমার’ গানটির আবেদন যেন একটু বেশি। এখনো বন্ধুদের আড্ডায় অথবা গানের কোনো আসরে ‘ফেরারী মন’ গানটির চাহিদা এবং দাপট মোটেই কমেনি। কিন্তু এমন দুর্দান্ত একটি গানের জন্ম হলো কেমন করে, সে-কী কেবল গান করতে হবে বলেই করা, নাকি অন্য কোনো ঘটনা লুকিয়ে আছে এর পেছনে? হেসেই জানালেন আইয়ুব বাচ্চু, ‘না, এই গানটি আসলে গান করতে হবে তাই করা তা কিন্তু না। গানটির পেছনে একটা দারুণ কাহিনিও কিন্তু রয়ে গেছে। ঘটনাটা প্রায় ৮৯ সালের দিকে চিটাগাঙে। আমি তখনো সোলস্-এই ছিলাম। আমার তখন প্রেমে পড়ে দিশেহারার মতো অবস্থা। খুবই সিরিয়াস প্রেম। কিন্তু যার সাথে প্রেম করি ওর সাথে সহজে দেখা করতে পারতাম না। যদিও এখন সে-ই আমার স্ত্রী এবং সন্তানের মা। আমার আবার একটা ব্যাপার আছে সেটা হলো, প্রেমের ক্ষেত্রে আমি কারো মধ্যস্থতা পছন্দ করি না এবং তখনো করতাম না। কাজেই অন্য কারো মাধ্যমেও ওর সাথে কোনো প্রকারের যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছিলাম না। তার উপর ওদের ফ্যামিলিটা ছিল খুবই কনজার্ভেটিভ। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস ওর কোনো খবরাখবর নিতে পারছিলাম না, আর আমাদের প্রেমটা তখন ছিল এক চরম নাটকীয়তার মুখে। ফাইন্যালি যে কী হবে বুঝতে পারছিলাম না। এজন্য প্রচণ্ড একটা টেনশন কাজ করত নিজের মাঝে। মেন্টালি খুব আপসেটও ছিলাম। মনের মাঝে এমন একটা ব্যাপার কাজ করত যে, মনে হতো সব বাধা তুচ্ছ করে যে-কোনো মূল্যেই হোক ওকে আমার পেতে হবে। আমাদের বাসায় আমার খুব প্রিয় একটা সোফা ছিল। একদিন রাতে খুব মনখারাপ করে আমার সেই সোফাটিতে বসে আছি। তখনই রাত প্রায় দেড়টা-দুইটার দিকে ওর আর আমার কথা ভাবতে ভাবতে তৈরি করে ফেলি ‘ফেরারী মন’ গানটি। একদিকে গুনগুন করে লিরিক্স করছি আবার একই সাথে সুরও করে ফেলছি। এর প্রায় আট-নয় মাস পর গানটিতে প্রথম তপনদা ভয়েস্ দেন।  অবশেষে ৯২ সালে সারগাম স্টুডিওতে রেকর্ডিং সম্পূর্ণ করে ওই বছরই শেষের দিকে এলআরবি-র প্রথম অ্যালবামের (জোড়া অ্যালবাম) মধ্য দিয়ে বাজারে চলে আসে।

ধিকি ধিকি :: মাইলস্

মাইলস্ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে / দুঃখের নদী বইয়া চলে / ও ও ও … ও ও ও।। # ভালোবাসি এত তোরে আগে বুঝি নাই / এখন তোরে কোথা পাই / উথালপাতাল বুকের মাঝে কইরাছি কী ভুল / তাই তো এই মনটা ব্যাকুল।। # তোরে ছাড়া এই জীবনে আপন কেহ নাই / এই কথা ক্যামনে বোঝাই / কোথায় গেলি ফাঁকি দিয়া বইলা গেলি না / তাই মনে সুখ পাইলাম না।।

[কথা : মাহমুদ খোরশেদ ।। সুর : শাফিন আহমেদ ।। ব্যান্ড : মাইলস্]

‘ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে’ গানটি মাইলস্-এর অন্যতম হিট গান। মূলত ‘ধিকি ধিকি’ গানটির কর্ড এবং গানটি লেখার পেছনের গল্পটা জানার জন্য কথা হয় মাইলস্-এর শাফিন আহমেদের সঙ্গে, আর তার মাধ্যমেই আলাপ হয় গানটির গীতিকার মাহমুদ খোরশেদের সঙ্গে। সেই সুবাদেই মাহমুদ খোরশেদ বললেন, ‘ধিকি ধিকি  গানটি আমি  আসলে লিখেছিলাম ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন। আমাদের লেকচার থিয়েটারটি ছিল মোটামুটি বড় একটা হলরুমের মতো। কিন্তু এর সিলিংটা ছিল অনেকটা নামানো, এসি লাগানো হবে বলে। কিন্তু এসির পরিবর্তে সিলিঙে ঝুলছিল কতকগুলো ফ্যান। ফ্যানগুলো ধুঁকতে ধুঁকতে ঘুরত আর এক-ধরনের শব্দ করত। শব্দটা এমন জোরালো ছিল যে স্যারের লেকচারও ভালো করে শোনা যেত না। ওই অবস্থায় বসেই মূলত বাংলা সিনেমা টার্গেটে রেখে গানটি লিখেছিলাম।’ যা-ই-হোক, মাহমুদ খোরশেদ ভেবেছিলেন ‘ধিকি ধিকি’ গানটি হবে মূলত বাংলা সিনেমার একটি গান, যে-গানের দৃশ্যে দেখা যাবে নায়িকা কলসি কাঁখে জল আনতে যাচ্ছে নদীতে। সেই নদীটি বয়ে গেছে এঁকেবেঁকে, সাথে গান হচ্ছে ‘ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে / দুঃখের নদী বইয়্যা চলে’। সেই কথা ভেবেই তিনি যান শাফিনের কাছে। শাফিন আহমেদ তখন কোনো-একটা বাংলা সিনেমায় মিউজিকের কাজ করছিলেন। গানটি দেখে তিনি মাইলস্-এর জন্যই রেখে দেন এবং পরে মুখটা সুর করে ফেলেন। পরবর্তীকালে মাহমুদকে জানালে তিনি অন্তরাগুলো লিখে দেন।

মা :: নগরবাউল

নগরবাউলদশমাস দশদিন ধরে গর্ভে ধারণ / কষ্টের তীব্রতায় করেছে আমায় লালন / হঠাৎ কোথায় না-বলে হারিয়ে গেল / জন্মান্তরের বাঁধন কোথা হারালো / সবাই বলে ওই আকাশে লুকিয়ে আছে / খুঁজে দেখো পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে / রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস / কোথায় আছে কেমন আছে মা / ওরে তারা রাতের তারা মাকে জানিয়ে দিস / অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারি না।। # মায়ের কোলে শুয়ে হারানো সে-সুখ / অন্য সুরে খুঁজে ফিরি সেই প্রিয় মুখ / অনেক ঋণের জালে মাগো বেঁধেছিলে তাই / বিষাদের অভয়ারণ্যে ভয় তবু পাই।।

[কথা ও সুর : প্রিন্স মাহমুদ ।। ব্যান্ড : নগরবাউল (ফিলিংস্)]

জেমস। মিউজিক নিয়ে ফিলিংস্-এর সাথে পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পথ। উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তারপরও যে-গানটি জেমসের জন্য এক অনবদ্য সৃষ্টি সে-গানটির জন্ম খুব বেশিদিনের নয়। বছরও গড়ায়নি ‘মা’ গানটি সৃষ্টি হয়েছে। আর এই অনবদ্য সৃষ্টির জন্মকথা নিয়ে প্রিন্স মাহমুদ বলেন, ‘আমি তখন এখনো দুচোখে বন্যা-র কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এনেছি। এমন সময় মাথায় বুদ্ধি এল একেবারেই ভিন্ন কিছু তৈরি করব। মাকে স্মরণ রেখে ঠিক করলাম মা নিয়েই একটা গান লিখব। আমি আমার আত্মা থেকে সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে লিখে ফেললাম মা গানটি। তখনো জেমসের কোনো গান রেকর্ড করিনি। তাই ঠিক করলাম জেমস ভাইকে দিয়েই ‘মা’ গানটি গাওয়াবো। মা  গানটির সুরও যথারীতি ব্যতিক্রম করার জন্য উঠেপড়ে লাগলাম। তৈরি হলো সুর। মা  গানের সুরটা তৈরি হবার পর থেকে আমি অনেকটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। এরপর জেমস ভাই গানটা শোনার পর খুব প্রশংসা করলেন। আর গানটা সাউন্ড গার্ডেন-এ রেকর্ডিঙের আগে যখন আমি গাচ্ছিলাম তখন সাউন্ড গার্ডেনের সাউন্ড-ইঞ্জিনিয়ার মবিন সরাসরি বলেই দিলেন — প্রিন্স, সত্যিই তুমি একটা অদ্ভুত গান সৃষ্টি করেছ! এক-কথায় এটা তোমার অনবদ্য সৃষ্টি। … মবিনের কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। তবে তারচেয়েও বেশি ভালো লেগেছিল যখন জেমস ভাই গানটি করেন। কারণ জেমস ভাই তার সবটুকু অনুভূতি ঢেলে দিয়ে মা  গানটা করেছেন। আমি ঠিক যেমনটা চেয়েছি, মা  গানটা তেমনই হয়েছে। হয়তো আমি ও জেমস ভাই দু-জনেই বাবা-মাকে হারিয়ে তাদের শূন্যতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। আর তারই ফসল হিশেবে আমাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে এসেছে মায়ের সঠিক একটা অর্থ, যা পৃথিবীর সমস্ত মা-জাতিকে উৎসর্গ করেছি।

মাঝরাতে চাঁদ যদি :: অবসকিউর

অবসকিউরমাঝরাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায় / ভেবে নেবো আজ তুমি চাঁদ দেখোনি / আকাশের নীল যদি আঁধারে মিলায় / ভেবে নেবো তারে তুমি মনে রাখোনি।। # আকাশের বুক চিরে যদি ঝরে জল / বুঝে নেবো অভিমানে তুমি কেঁদেছ / সরোবরে যদি ফোটে রক্তকমল / অনুভবে বুঝে নেবো মান ভেঙেছ।। # রূপালি বিজলি যদি নীরব থাকে / কেঁদো না ভেবো শুধু আমি তো আছি / স্বপ্নলোকে যদি ময়ূরী ডাকে / বুঝে নিও আমি আছি কাছাকাছি।।

[কথা : এহসান চৌধুরী ।। সুর : অবসকিউর ।। ব্যান্ড : অবসকিউর]

কথা হলো অবসকিউর-এর টিপুর সাথে। তিনি জানালেন একেবারে শুরুর ঘটনা। ‘আমরা যখন খুলনায় থাকতাম, তখন আমাদের ওই জায়গাটার পরিবেশ ছিল একেবারেই অসহনীয়। দেখা গেল আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় যে-অবক্ষয় সেটা হলো প্রায় সবাই ধীরে ধীরে অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ছে। আমরা ক-জন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা এ-ধরনের অবক্ষয়ের পথে যাব না। কিন্তু কিছু-একটা তো করতে হবে, তাই বেছে নিলাম সংগীতকে। নিজেরাই টুকটাক মিউজিক প্র্যাক্টিস্ করে সময় কাটাতাম, একদিন অফার এল একটা মিউজিক্যাল-শোতে আমাদের গান গাইতে হবে। এতদিন বিভিন্ন ধরনের গান প্র্যাক্টিস্ করতাম কিন্তু স্টেজ-শো করতে হলে তো নিজস্ব কিছু গান থাকতে হবে, তাই জোর দিলাম সেদিকে। এহসান চৌধুরী আমাদের সাথেরই এক ছেলে; ও সাধারণত কবিতা লিখত, তো ওকেই জোর করে ধরলাম, তোমাকে গান লিখতে হবে! এহসান তো দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেল, বলল — আমি তো কবিতা লিখি, গান লিখব কী! যা-ই-হোক, শেষ-পর্যন্ত এহসানই লিখল মাঝরাতে চাঁদ, নিঝুম রাতের আঁধারে  সহ বেশকিছু গান। স্টেজ-শোও  করলাম বেশকিছু। এভাবে আমাদের প্রায় ৩২-৩৬টি গান কম্পোজ করা হয়ে গেল। ৮৬ সালের দিকে বর্তমান অডিও আর্ট-এর পান্না ভাই প্রথম সারগাম-এ যোগ দেন। তিনিই আমাদের অফার দেন অ্যালবাম বের করার। অবশেষে নির্বাচিত ১২টি গান নিয়ে মাত্র দুই রাতের রেকর্ডিঙে শেষ হয় অ্যালবামের কাজ। অতঃপর সারগাম-এর প্রযোজনায় আমাদের প্রথম অ্যালবামের মধ্য দিয়ে মাঝরাতে চাঁদ যদি আলো নাবিলায়  গানটি পৌঁছে যায় ভক্ত-শ্রোতাদের কাছে।’

শাবাস নূর হোসেন :: প্রমিথিউস

প্রমিথিউস(জন্মানোর পর থেকেই সংগ্রামকে বুকে চেপে যার জীবন হয় শুরু, সেই নূর হোসেন। এই নূর হোসেনকে চলতে দাও উদ্দাম গতিতে, উড়তে দাও শান্তির পায়রার মতো আর মিছিল করতে দাও বজ্রকণ্ঠে। এই নূর হোসেনকে কোরো না কোনো ব্যক্তির কিংবা কোনো গোত্রের, কিংবা কোনো গোষ্ঠীর। নূর হোসেন আমার বাংলা মায়ের দীপ্তকণ্ঠে জ্বলে-ওঠা এক অতন্দ্র প্রহরী) # যে-ছেলে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে / ঢাকার রাজপথ রাঙিয়ে যায় / যার কথা মিশে আছে বাংলার দিকে দিকে / সৃষ্টি হয়েছে এক ইতিহাস / যুদ্ধ জয় করে দিয়ে যায় ঘরে ঘরে / নতুন স্বপ্ন-আঁকা শতাব্দী / মিছিলের তালে তালে বজ্রকণ্ঠে বলে / জিরো পয়েন্ট আমি সংগ্রামী / সে-বঙ্গবীর নূর হোসেন তুমি।। # তোমার মৃত্যু যেন মৃত্যু হলো না / ছড়িয়ে পড়লে তুমি শিখা হয়ে / আবার নতুন করে প্রমাণ করে দিলে / শক্তির অবিনাশিতাবাদকে / বাংলার আকাশে উঠেছে সূর্য / সে-তো হায় ওগো বীর তোমারি কারণ / মোদের প্রতিটি কাজে যুগে যুগে রয়ে যাবে / তোমার একেকটি প্রতিফলন / ও বঙ্গবীর নূর হোসেন শোন।।

[কথা ও সুর : বিপ্লব ।। ব্যান্ড : প্রমিথিউস]

‘৯০-এর গণ-আন্দোলনে নূর হোসেনের মহান আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে চির অম্লান করে রাখার জন্যই প্রমিথিউসের প্রয়াস ‘নূর হোসেন’ গানটি। বিপ্লব জানালেন, নূর হোসেন  গানটি একটু ভিন্ন ধাঁচের গান। আমাদের এই নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না ৭১-এ আমাদের স্বাধীনতা আদায়ের প্রতিবাদমুখর সেই দিনগুলো বাস্তবিক কি-রকম ছিল, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শহিদদের আত্মত্যাগের মহিমা কতটা সাহসিকতাপূর্ণ ছিল। তাই ৯০-এর গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটটা আমাদের কাছে একটা মডেল হয়ে দাঁড়ায়, যার মাঝে সেই ৭১-এর প্রতিবাদমুখর দিনগুলোর একটা ছোঁয়া পাওয়া যায়। ড. মিলন, নূর হোসেন এদের আত্মত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ৫২-র ভাষা-আন্দোলন আর ৭১-এর স্বাধীনতা-সংগ্রামে সমস্ত জাতির স্বার্থ রক্ষার্থে জীবনদানকারী শহিদদের কথা। ৯০-এর আন্দোলন যেন ছিল নবপ্রজন্মের কাছে আরেক ৭১। ৫২-র ভাষা-আন্দোলনে শহিদদের নিয়ে অনেক গান লেখা হয়েছে, কবিতা ছাপা হয়েছে, উপন্যাস লেখা হয়েছে; লেখা হয়েছে ৭১-এর স্বাধীনতা-সংগ্রামে শহিদদের নিয়ে, রচিত হয়েছে কত-না নাটক, সিনেমা, আরো কত-কী! কিন্তু ৯০-এর আন্দোলনে শহিদ-হওয়া নূর হোসেনদের নিয়ে কি হয়েছে, কতটা হয়েছে? গণতন্ত্র রক্ষার জন্য, সবার দাবি আদায়ের জন্য যে-মানুষগুলো তাদের নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহিদ হলো তাদের নিয়ে কেউ তো তেমন গান লেখেনি, সিনেমা করেনি। বরং নূর হোসেনের শহিদ হওয়ার পর কতিপয় রাজনৈতিক দল দাবি করল নূর হোসেন তাদের দলের লোক, এই নিয়ে কত বাকবিতণ্ডা। নূর হোসেনের এই মৃত্যুকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু হলো। নূর হোসেনের এই আত্মাহূতি-যে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত জাতির কল্যাণের জন্য তা ভাবা হচ্ছিল না। তাই নতুন প্রজন্মের সামনে নূর হোসেনের এই আত্মত্যাগের মহিমাকে স্বতন্ত্র এক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তুলে ধরার জন্য বিপ্লব লিখলেন নূর হোসেন  গানটি। ৯২-এর ১৬ ডিসেম্বর রমনার শতায়ু অঙ্গনে এর প্রথম শো হয়। মেলে ব্যাপক সাড়া। অবশেষে অডিও আর্ট স্টুডিওতে অ্যালবামের জন্য রেকর্ডিং কমপ্লিট করে ৯৩-এ রিলিজ হয় গানটি।

ভালো লাগে জ্যোৎস্নারাতে :: রেনেসাঁ

রেঁনেসাভালো লাগে জ্যোৎস্নারাতে / মেঘ হয়ে আকাশে ভাসতে / ধানের শীষে বাতাস হয়ে / কিষাণীর মন ছুঁয়ে যেতে / ভালো লাগে রোদ হয়ে / ওই পাখির ডানা ছুঁয়ে খেলতে।।  # আমার জানালায় উদাস দুপুর / কবিতার বই খুলে দেখছি / গায়ের সে-পথে জামের মুকুল / পড়ে আছে পাকা লাল বট ফল / এক গরুর গাড়ি সেই-সে পথে / ক্লান্তির ছাপ রেখে চলছে।। # সেগুন কাঠের ওই দরোজা ভেঙে / বিকেলের রোদ এসে থামলে / আমার কবিতা শুকসারি হয়ে / স্বপ্নচেতনায় শিস দেয় / আমি পিয়ানোতে হাত রেখে / ভালোলাগা সব ধরে রাখছি।।

[কথা : ডাক্তার মোহাম্মদ আরিফ ।। সুর : নকীব খান ।। ব্যান্ড : রেনেসাঁ]

রেনেসাঁর নকীব খান জানালেন গানটির অদ্ভুত জন্ম-ইতিহাস। ‘প্রায় চৌদ্দ-পনেরো বছর আগের কথা। আমি আর ডাক্তার আরিফ ট্রেনে করে এক বিকেলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরছি। দু-জনেই জানলা দিয়ে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে দেখছিলাম বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য। দেখছিলাম, ধানক্ষেতের উপর দামাল হাওয়ার কী অক্লান্ত ছোটাছুটি! ধানগাছগুলো যেন সেই হাওয়ার পরশ নিতে কখনো শুয়ে পড়ছিল, আবার কখনো-বা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছিল। দূরে নীল আকাশের বুকে উড়ে চলছিল কিছু পাখি আর তাদের ডানায় উছলে পড়ছিল পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আলো। এসবকিছু দেখতে দেখতেই ডা. মোহাম্মদ আরিফ আর আমি যেন খানিকটা উদাস হয়ে গেলাম। ডা. আরিফই এক-সময় লিখে ফেললেন, ধানের শীষে বাতাসডানা ছুঁয়ে খেলতে  — এই কথাগুলো। তারপর ক্রমশ যখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল তখনই আকাশের বুকে আস্তে আস্তে হেসে উঠল একখানা চাঁদ, আর সেই চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল ভেসে-থাকা মেঘগুলো। তখনই লেখা হয়েছিল ভালো লাগে জ্যোত্স্নারাতেআকাশে ভাসতে । প্র্যাক্টিসের সময় গানের স্বার্থেই পরে-লেখা এই লাইনটিকে গানের প্রথম লাইন হিশেবে নেওয়া হয়। এরপর আর ট্রেনে নয়, ঢাকায় এসে এই গানটিকেই সুর করে কম্পোজ করে ফেলি। গানের মুখটা তো ওই ট্রেনেই লেখা হয়ে গেল। বাকি অন্তরাগুলো ঢাকাতে বসেই আস্তে আস্তে লিখে ফেলেন ডাক্তার আরিফ। দ্বিতীয় অন্তরাটুকু মোটামুটি একটা ঘরের অবয়ব ফুটিয়েছে, যে-ঘরটাতে বসে কাজ করছি, কবিতা লিখছি বা পিয়ানোতে হাত রেখে মনের কথাগুলোকে সুরের বাঁধনে বেঁধে রাখছি। এমনি কতকগুলো ভালোলাগার ব্যাপার যা আসলে বলে বোঝাবার নয়। এখানে আমার একান্ত নিজস্ব একটা ইনফ্লুয়েন্স কাজ করেছে। মোটামুটি ৮৪-৮৫ সালের দিকেই গানটি শুরু করলেও অ্যালবামের জন্য রেকর্ডিং করা হয় প্রায় ৮৭-৮৮ সালের দিকে সারগাম স্টুডিও  থেকে।

নিঃসঙ্গতা :: সোলস্

সোলস্কেন এই নিঃসঙ্গতা, কেন এই মৌনতা / আমাকে ঘিরে / কেউ না জানুক কার কারণে / কেউ না জানুক কার স্মরণে / কোন পিছুটানে / তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে / জীবনের নিয়মে।। # স্বপ্নগুলো অন্য কারো, ভুলগুলো আমারই / কান্নাগুলো থাক দু-চোখে, কষ্ট আমারই / ভেবে নেবো প্রেম আলেয়ার আঁধারই / কেউ না জানুক কোন বিরহে / দিন চলে যায় আজ কীভাবে / কোন পিছুটানে।। # ইচ্ছেগুলো থাক হৃদয়ে, ব্যর্থতা আমারই / সুখ না-হোক অন্য কারো, দুঃখরা আমারই / ভুলে যাব মন কেন আজ ফেরারী / কেউ না জানুক কোন হতাশায় / দিন চলে যায় নীরবে হায় / কোন পিছুটানে।।

[কথা : কবির বকুল ।। সুর : পার্থ বড়ুয়া ।। ব্যান্ড : সোলস্]

‘এই গানটা তৈরি হয়েছে এক-ধরনের নিঃসঙ্গতা আর মৌনতার মধ্য দিয়ে অনেকটা হঠাৎ করে। তখন আইয়ুব বাচ্চু সোলস্  ছেড়ে দিয়েছেন।’ — বললেন সোলস্-এর পার্থ বড়ুয়া, — ‘৯৪ সালের ঘটনা। বিটিভির প্রযোজক ফিরোজ মাহমুদ গীতিবিচিত্রা  অনুষ্ঠানের জন্য ভিন্ন-ধরনের একটি গান চাইলেন পার্থর কাছে। গানটা তিনি চাইলেন দু-একদিনের ভেতর দিতে। তখন সোলস্-এর আজাদ, তানিম এরা সবাই ছিল। তো, এদের নিয়ে একদিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চেষ্টা করেও মনের মতো কোনো গান করা গেল না। রাত প্রায় সাড়ে-বারোটা/একটার দিকে সবাই প্র্যাক্টিস্ বন্ধ করে বিষণ্নতা নিয়ে গেলাম তাজ হোটেলে খাওয়াদাওয়া করতে। খেতে খেতে হঠাৎ ডিসিশন নিলাম কবির বকুলকে দিয়ে গানটা লেখানোর। কবির বকুল তখন থাকতেন তপন চৌধুরীর বাসায়। যেই ভাবা সেই কাজ, চলে গেলাম সেখানে। গিয়ে কবির বকুলকে ধরে নিয়ে আসলাম। রাত প্রায় একটা-দেড়টার দিকে সবাইকে বিদায় দিয়ে আমি আর কবির বকুল এসে আমার বাসায় বসলাম। গভীর রাত, আশেপাশে কেউ নেই, সবকিছুই যেন নিস্তব্ধ। এমনি এক নিবিড় মৌন পরিবেশে বসে কবির বকুল লিখে চললেন কেন এই নিঃসঙ্গতা কেন এই মৌনতা  গানটি, আর আমিও সুর করে চললাম একটানা। মাত্র ৩০-৩৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা গানটির প্রথম অন্তরা পর্যন্ত কমপ্লিট করে ফেললাম। পছন্দ হয়ে গেল গানটি। তাই পরের অন্তরাটুকুও কমপ্লিট করে ফেললাম। মজার ব্যাপার হলো গানটি করার সময় কিন্তু ছন্দ বা ওই ধরনের কিছুর দিকে লক্ষ রাখা হয়নি। ঠিক তাত্ক্ষণিকভাবে যা লেখা হয়েছে তা-ই কম্পোজ করা হয়েছে। মোট কথা, গানটা যা লেখা হলো তা-ই কম্পোজ করা হয়েছে, কোনো প্রকার কমানো-বাড়ানোও হয়নি। পরদিন ভিটিআর। তাই পরদিন দুপুরে গিয়ে গানটির রেকর্ডিং শেষ করলাম। তাড়াহুড়োর জন্য নিখুঁতভাবে তেমন কিছু করা গেল না, খসড়া যা হয়েছে সেটাই জমা দিলাম বিটিভিতে। ঠিক ওভাবেই গানটি প্রচার হলো এবং তুমুল জনপ্রিয়তাও পেয়ে গেল। পরে অবশ্য অ্যালবামের জন্য গানটার মিউজিক রেকর্ডিং মোডিফাই করে নেওয়া হয়েছে। গানটা রেকর্ড করেছিলাম অডিও আর্ট স্টুডিওতে আর রেকর্ডিং করেছিল চারু এবং মিক্সড করেছিলেন বাবু।

বাংলাদেশ :: উচ্চারণ

আজম খানরেললাইনের ওই বস্তিতে / জন্মেছিল একটি ছেলে / মা তার কাঁদে / ছেলেটি মরে গেছে / হায় রে হায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশ … বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।। # কত আশা ছিল তার জীবনে / সব স্মৃতি রেখে গেল মরণে / মা তার পাশে / চেয়ে বসে আছে / হায় রে হায় বাংলাদেশ … # কত মা-র অশ্রু আজ নয়নে / কে তা বোঝাবে তা কেমনে / যে চলে যায় / সে কী ফিরে আসে / হায় রে হায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশ … বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।।

[কথা ও সুর : আজম খান ।। ব্যান্ড : উচ্চারণ]

জর্জ হ্যারিসনের বাংলাদেশ  গানটি যেমন বাঙালি জাতির জন্য একটি দুর্লভ প্রাপ্তি, তেমনি আজম খানের বাংলাদেশ  (রেললাইনের ওই বস্তিতে) গানটি সংগীতপিপাসু বাঙালি জাতির জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। গানটি শোনামাত্রই যে-কোনো মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে সন্তানহারা বাংলার এক দুঃখিনী মায়ের হাহাকারভরা বিমূর্ত এক চিত্র। কিন্তু এই অসাধারণ গানটি কেমন করে লিখলেন, সেই কাহিনিটা না-হয় আজম খানের মুখ থেকেই শোনা যাক : ‘বাংলাদেশ  গানটি করি আনুমানিক ৭২ বা ৭৩ সালের দিকে। ৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের পরপরই দেশের কি অবস্থা ছিল তা তো সবাই জানেন। গোটা দেশ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। কোথাও এতটুকু খাবার নেই। চারিদিকে খাদ্যের জন্য হাহাকার পড়ে যাচ্ছিল। আর ক্রমেই দুর্ভিক্ষের আকার ধারণ করছিল। তাই খাদ্যের জন্য আর বেঁচে থাকার জন্য সবাই ছুটে আসছিল রাজধানী-শহর ঢাকাতে। সবার ভেতর একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গিয়েছিল ঢাকায় আসতে পারলে যে-কোনোভাবেই-হোক উপায় একটা হবেই। তাই দূর-দুরান্ত থেকে মানুষজন ঢাকায় ছুটে আসতে থাকে। আর এসে ট্রেন থেকে নেমেই কোনোক্রমে মাথা-গোঁজার একটু ঠাঁই করে নিচ্ছিল। কমলাপুরে তাকালেই দেখা যেত শুধু মানুষ আর মানুষ। চারিদিকে অসহায় সব মানুষের আর্তচিত্কার। এরই মাঝে কত মানুষ না-খেতে পেরে মারা যাচ্ছিল তার হিসাবও ছিল না, বরং একজনের মৃত্যুতে মনে হতো যে একজন মানুষের খাদ্যের দুশ্চিন্তা কমলো। এসব আসলে সামনাসামনি না-দেখলে উপলব্ধি করা যায় না। চারিদিকেই একটা হৃদয়বিদারক দৃশ্য। আমি বিকেলে যখন গানটান করে বাসায় ফিরতাম তখন এসব দেখে আমারও খুব খারাপ লাগত। কিন্তু আর কি করতে পারি! গানটান করে যে-ন্যূনতম টাকা পেতাম পকেট হাতড়ে সেটাই বিলিয়ে দিতাম। আমার এই সামান্য অনুদানে হয়তো তাদের কিছুই হতো না, কিন্তু যা-ই পারতাম দিতাম। এসবকিছু দেখেই মূলত আমি বাংলাদেশ  গানটি লিখি। এরপর বেশ কয়েকজনের দ্বারা গানটি রেকর্ড হয়েছিল। যেমন, ৮২ সালে রকেট রেকর্ড করেন ঝঙ্কার স্টুডিওতে। ৮৬ কি ৮৭ সালের দিকে রকেট এবং মাসুম রেকর্ড করেন শ্রুতিতে। আবার এই সময়ের দিকেই আইয়ুব বাচ্চু রেকর্ড করেন সারগাম স্টুডিওতে।

...

Leave a comment

Filed under সারথি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s