মানু ও বিনয়ের সঙ্গ-প্রসঙ্গ / জাবের হাসান

binoy 2

“পাখিরা দাঁত মাজে না
তাই মানুষ যখন দাঁত মাজে
তখন পাখিরা বুঝতে পারে না
এই মানুষগুলো কি করে”

দর্শনে একটি সমস্যা আলোচিত হয় ‘আদার মাইন্ড প্রবলেম’ নামে। এই সমস্যার মূল বিষয় হলো আমরা অন্যর মানসিক অবস্থা বুঝতে পারি কি পারি না তা নিয়ে। ধরি, আমি মিষ্টি খেলাম; অন্য কোনো মানুষ কিন্তু কখনো বুঝতে পারবে না এই মিষ্টি আমার কাছে কতটুকু মিষ্টি লাগছে, কিংবা আমি যদি তিতাকে মিষ্টি বলি, অন্যরা তা মিষ্টি বলে মেনে নিতে বাধ্য। অর্থাৎ মিষ্টত্তের ধারণা কেবল আমার মধ্যে নিহিত, মানে এর ধারণা সাব্জেক্টিভ।

cycle 1

নুরুল আলম আতিকের ‘সাইকেলের ডানা’ দেখে তা-ই মনে হলো। শুরুর সেই কবিতার মতো : পাখিরা দাঁত মাজে না তাই তারা বুঝতে পারে না মানুষেরা কি করে। আমাদের অবস্থাও পাখিদের মতো, আমরাও বুঝতে পারি না মানু কি করে কিংবা কোন জগতে থাকে। মানুর জগৎ আর পাখিদের জগৎ একই হয়ে যায়। সবাই যে-যার মতো একই জগতে থাকে। ঐ জগতে পাখির ভেতর পাখি ফুলের ভেতর ফুল, প্রজাপতির রঙের ভেতর রঙ সবই থাকে। শুধু ঐ জগতে ডুব দেওয়ার অপেক্ষা। কেউ কেউ খুব তাড়াতাড়ি ঐ জগতে ডুব দিতে পারেন কিংবা থাকতে পারেন। মানুর সাইকেলে তাই ডানা গজায়। মানু ঐখানে থাকতে গিয়ে সাইকেলের হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া দেখে। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে স্ট্যাচু হয়ে যায়।

jaber 4

গল্পের, সিনেমার কিংবা কবিতার কোনো-না-কোনো চরিত্র কারো-না-কারো প্রতিনিধিত্ব করে। জীবনানন্দের বনলতা সেন কিংবা সুরঞ্জনা কোনো-না-কোনো বনলতা সেন কিংবা সুরঞ্জনার প্রতিনিধিত্ব করে। আবার লেখক হিসেবে জীবনানন্দের ভেতর খেলা করে বনলতাসেন-সুরঞ্জনারা। ওরা থাকুক কিংবা না-থাকুক তারা জীবনানন্দের জগতে আছেন। এ বড় রহস্যময় জগৎ। মানুর ওই বিশাল জগতে বসবাস করে তার বন্ধু সরফুল, সরফুল মানুর খেলার সঙ্গী। সরফুল-মানু ওরা মিলে চরে ফুটবল খেলতে যায়। চর পড়লে বোধহয় ফুটবল খেলাই নিয়ম, ওরা সেই নিয়ম মেনে ফুটবল খেলে। এই খেলা নিয়ে সরফুল মারাও যায়। সরফুল কি মারা যায়, কিংবা সরফুল কি আদতেই ছিল? ছিল শব্দটা আপাতত আমার কাছে প্রশ্নবোধক, মূলত রিয়েল লাইফ অর্থে আমার কাছে প্রশ্নবোধক? তাহলে আবার বলা যায় সরফুল আছে। কিন্তু কোথায়? আছে যেহেতু বললাম সেহেতু কোথাও-না-কোথাও থাকতেই হবে। তাহলে সরফুলরা থাকে মানুর জগতে। এই যুক্তিতে একজন বিনয়, জীবনানন্দ, আতিক, আমরা সবাই মানু।

সাইকেল একটা ক্লীব বস্তু। তার আবার ডানা কই? এই ডানা দেখবার জন্য দরকার পড়ে ভাবনার, ভাবনার বিস্তারের। আমরা সবাই এই ডানা দেখবার সম্ভাবনা নিয়ে জন্মাই। কিন্তু আবার হারানো বলে একটা জিনিশ যেহেতু আছে তাই তারে আমরা আবার হারায়ে ফেলি … হারাইয়া ফেলি চকিতে।

বরুনকে সাপে কেটেছে। আজ বরুন চলে গেল। বুকের মাঝে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে…” — মানুর ডায়েরি থেকে।

মানুও হারাতে থাকে। সে তার জগতেই হারাতে থাকে তার বন্ধু বরুন হারিয়ে যায় সাপের কামড়ে। কলার ভেলায় বরুন চলে যায়। আচ্ছা বরুনের কি পুনর্জন্ম আছে? যদি থাকে তাহলে কি মানুর জগতে?

শুরুতে যে রেলগাড়ি দেখা যায় সেই রেলগাড়িতে আসলে মানু নিজেই ভ্রমণ করে। নিজে নিজেই হয়তো বলে যাত্রা শুভ হোক। মানু যাত্রাবিরতিতে মোষের পিঠে উঠেছিল, তাও আবার উল্টো মোষ। মোষ এখানে হয়তো বিনয়ের প্রকৃত সারস। যে কি-না দাঁত মাজতে পারে না।

জানো হারুভাই আমারনা একটা সাইকেল আছে। ভাঙা। তোমাকে দিয়ে সারাবো। একদিন হয়েছে কি জানো ছবিদের বাসার ছাদে সাইকেল চালাচ্ছি, নাছবিদের তো ছাদ নেই। না কিচলুদের ছাদে, না সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রেলস্টেশন থেকে ছাদ দেখা যায়। আমি আর সরফুল ছাদে বসে আছি, দেখি একদল পিঁপড়াআমি তখন ছাদের উপর বাথরুম করছি, মানে হিশু করছি হারুভাই, সরফুল এখানে আসে না? সরফুল আর আসবে না। চলে গেছে মামাবাড়ি। আমায় না বলেই চলে গেলমানুর কথামালা।

সরফুল বরুনরা এত ডাকাডাকির পরও আসে না। আবার আসেও বটে … । তারা মানুর কাছে আসে। বারেবারেই ফিরে আসে। ফিরে এসো চাকা … ।

binoy  4

কিন্তু ব্যাক্তি বিনয় মজুমদার কেমন? তিনি কি এক অর্থে মানু?

“ব্রহ্মদেশে জন্মলাভ করে শেষে পূর্ববঙ্গে আজ পাড়াগাঁয়ে
একটি বিলের মধ্যে বাস করে, তারপরে কলকাতা এসে
শিবপুর থেকে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে
এখন গণিতচর্চা এবং সাহিত্যচর্চা করি।
আমার ছেলের নাম কেলো, বৌ রাধা।”

— এভাবেই নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন বিনয় মজুমদার।

ভালোবাসা দিতে পারি তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম” — বিনয় মজুমদার

বিনয় মজুমদারের মধ্যে দুঃখ এবং দুঃখের মধ্যে বিনয় মজুমদার একাকার হয়ে যান। বিনয়ের কবিতায় এত দুঃখ কেন? মানুষের জীবন বলেই হয়তো। বিনয় কি তাহলে মানু? হ্যাঁ, মানুই তো। মানুর সঙ্গীরা একে একে হারিয়ে যায়। অন্যদের বাস্তব জগতে সে অপরিচিত, নিজের জগতের কোনো ঠিকানাঠিকুজি নেই। শুধু বয়ে নিয়ে চলা। এত মিথ অফ সিসিফাস, উদ্দেশ্য আছে হয়তো কিন্তু কোনো সমাপ্তি নেই। তাহলে এই বয়ে নিয়ে যাওয়া কেন? হয়তো উত্তর আছে কিংবা নেই। বিনয় কি আরেকটি ‘ফিরে এসো চাকা’ লিখবেন বলে মানুর মতো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে স্ট্যাচু হয়ে যান?

যে গেছে সে চ’লে গেছে ; দেশলাইয়ে বিস্ফোরণ হয়ে
বারুদ ফুরায় যেন; অবশেষে কাঠটুকু জ্বলে
আপন অন্তরলোকে; মাঝে মাঝে সহসা সাক্ষাৎ
তারই অনুজার সাথে” — বিনয় মজুমদার

তাহলে কি বিনয় ও মানুর মানুষ পছন্দ? পছন্দ হলে কারা? মানু কি কাউকে পছন্দ করে? ছবিকে করত? জানি না। মানু তার ডায়েরিতে লিখেছিল, ‘ছবি খুব ভালো’। বেশ কায়দা করে, ধরতে পারাটা মুশকিল, একটু রহস্যপূর্ণও বটে। ছবি সরফুলের ছোটবোন। ছবি তাকে ঝিঁঝির শব্দওয়ালা একখান কাঠি দিয়েছিল, ঐ নিয়ে সে অলিতে-গলিতে হাঁটতে থাকে, কিছু-না-কিছু খুঁজে বেড়ায়। যেভাবে বিনয় গায়ত্রীকে নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা হাঁটতে থাকেন। কখনো কবিতা- প্রকৃতি অথবা গণিতের গলিতে। আমরাও তো কিছু-না-কিছু খুঁজে বেড়াই, না-হলে নেশায় মত্ত হয়ে হাঁটতে গেলে ছিনতাইকারী মনে করে অন্য মানুষ যদি মারে ঐ ভয় থাকবে কেন! তাহলে কি আমরা সবাই এক? তার কারণ কি আমাদের সবার রয়েছে সিসিফাসের জীবন?

মানু কি পালাতে চায় তার জগৎ থেকে? হয়তো চায়। না-হলে কাপড় টাঙানোর কিংবা গরু বাঁধার দড়ি যথাস্থানে ব্যবহার না-হয়ে মানুর গলায় উঠবে কেন? তাহলে কি সবাই পালাতে চায়! এই পালানোর প্রক্রিয়া কি একেকজনের একেক রকম? বিনয় পালানোর অজুহাতে কবিতা লিখে, কেউ সিনেমা বানায়, কেউ আঁকতে বসে। সর্বোপরি সকল শিল্পচর্চা এক-ধরনের অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়।

“অথচ পায়রা ছাড়া অন্য কোনো উড়ার ক্ষমতাবতী পাখি
বর্তমান যুগে আর মানুষের নিকটে আসে না” — বিনয় মজুমদার।

তাহলে মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যাবে কেন? মানুর আশেপাশে তো অনেকেই থাকে : তার বাবা মা বোন কুলফিওয়ালা মামা ছবি কিংবা সরফুল। বিনয়-মানুরা কি এদের কাছ থেকে বাঁচতে গিয়ে সিজোফ্রেনিক হয়ে পড়েন! বোধহয় এই শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণা নিয়ে শহরে বেঁচে থাকাটাই আনন্দের।

binoy 5

বিনয়ের কথামালা মানুর মতোই আত্মমুখী। বহির্জগতের চেঁচামেচি তাদের ভালো লাগে না। চেঁচিয়ে বেড়ায় তো অনেকেই — হোক সে ক্যানভাসার, গলির মাইকওয়ালা, কিংবা সুশীল আবৃত্তিকার; কিন্তু অন্তরে ঢুকেই-বা কজন!

মেঘের ভেতর থেকে একঝাঁক সাইকেল থেকে একটি সাইকেল পড়ে গেল… — মানুর কথামালা

“কুক্কুপিন্ট ফুলের ভিতরে
জ্বরাক্রান্ত মানুষের মতো তাপ; সেই ফুল খুঁজি” — বিনয় মজুমদার।

জ্বরের ঘোরে মানু আর বিনয় কি দেখে? সরফুল তো জয়নগর চলে গেল। তারপর বিনয় আর মানু একঝাঁক সাইকেল থেকে পড়ে-যাওয়া একটি সাইকেল নিয়ে অন্যজগতে বেরিয়ে পড়ে। আমরাও তাদের পিছু পিছু সারথী হই। হয়তো আমাদের সঙ্গী হয় গায়ত্রী, ছবি, … আমরাও সাইকেলে ডানা লাগিয়ে উড়বার চেষ্টা করি। যদি সিসিফাসের জীবনে কিছু-একটা পাওয়া যায় … পাথরটা ঠেলে তুলবার আগে যদি একবার ডানা লাগানো যায়!

jaber 3

...

jaber own জাবের হাসান

গদ্যকার।

Leave a comment

Filed under সারথি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s