একশ ছিচল্লিশ নং হাতিরপুলের গাছপালা (শেষ পর্ব) / মেসবা আলম অর্ঘ্য

[প্রথম পর্বের লিঙ্ক] [দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক]

 

            আমরা ট্যাবলেট থেতলে মিকচার বানাতাম। একশ ছিচল্লিশের উঠানে, শিউলিগাছের নিচে ছোট ছোট পুকুর খুড়তাম। রান্নাবাটি খেলতাম। আমাদের ছোট ছোট হাড়িপাতিল ছিল। চুলা ছিল। আমরা মৃত ডাবপাতা পুড়িয়ে চড়ুইপাখি রান্না করতাম ।

একদিন রইছউদ্দীন খান মারা যায়। আমরা তেমন কিছু বুঝতে পারি না। তবে দেখি অনেক লোক আসছে। শাদা কাপড়ে ঢেকে জনাব রইছউদ্দীনকে বের করা হচ্ছে। ওনার ছোট মেয়ে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে চিৎকার করে বলছে- “কই নিতাসেন আমার বাপরে কই নিতাসেন। আমার বাপরে নিতে পারবেন না”।

আমরা শিউলিগাছের নিচে গর্ত খুড়ে সেই গর্তে পানি ভরতে ভরতে লক্ষ্য করি ১৪৬ এর সেজো জামাতা বড় বড় পা ফেলে বাড়িতে প্রবেশ করছে। উনি চাকুরিসূত্রে ঢাকার বাইরে থাকতো। শ্বশুরের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে এসেছে। উঠানে খেলতে থাকা তার শিশুপুত্র বহুদিন পর পিতাকে দেখে লাফ দিলো। চিৎকার করে ডাক দিলো। কিন্তু উনি ফিরেও তাকালো না।

*

রইছউদ্দীন সাহেবের জানাজা হয় পরীবাগ মসজিদে। মসজিদের ঘরগুলি পুরাতন এবং ঠান্ডা। লাশ ট্রাকে ওঠানো হয়। আমরা ট্রাকে উঠি। চাপা উত্তেজনা অনুভব করি। সবার মুখমন্ডলে একটা অস্থির  স্তব্ধতা বিরাজ করছিল। আমরাও তাদের দেখাদেখি চুপ থাকার চেষ্টা চালাই। কিন্তু চুপ থাকতে পারি না। রাস্তাঘাট দেখি আর কথা বলি নিজেদের ভিতর। এত উঁচু থেকে ঢাকা শহরের এত এত অচেনা রাস্তা আমরা আগে কখনো দেখি নাই। উত্তেজনা চেপে রাখা সমস্যা। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি রইছউদ্দীন খান সাহেব মারা গেছে। সবার মন খারাপ। তাই আমরা ফিস ফিস করে কথা বলি।

লাশ কবরে নামানো হয়। আমাদের মনে হয় কবরটা অনেক গভীর। রইছউদ্দীনের দুই ছেলে, তিন জামাতা এবং উপস্থিত পুরুষ আত্মীয়রা হাতের মুঠিতে করে ছোট ছোট মাটির ঢ্যালা কবরে ফেলতে থাকে। আমাদেরও ফেলতে বলা হয়। আমরা কবরে মাটি ফেলি। আমাদের তেমন কোনো অনুভূতি হয় না। রইছউদ্দীন সাহেব শখের হোমিওপ্যাথি করতো। ওনার দুইটা কাঠের বাক্স ছিল ওষুধ রাখার, যেখান থেকে আমরা চিনির বড়ি চুরি করতাম। এই পরিস্থিতিতে ওই বাক্সগুলির কী হবে সেই চিন্তা আমাদের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে অনবরত। আমরা বুঝি আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিৎ। আমরা লজ্জিত হওয়ার চেষ্টা চালাই।

রইছউদ্দীন সাহেবের মৃত্যু আমাদের মনে তেমন গভীরভাবে রেখাপাত না করলেও ওনার জানাজার স্মৃতি আমাদের মনে থাকে। ওইদিনের পর থেকে পরীবাগ মসজিদে লাশ রাখার খাটিয়া দেখলেই আমাদের রইছউদ্দীন খানের কাফনে মোড়া মৃতদেহের কথা মনে পড়তে থাকে। আমরা খাটিয়াগুলি আরও বস্তুনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করা শুরু করি।

পরীবাগ মসজিদটা পুরানো মনে হয়। মসজিদের মিনারটাও প্রাচীন মনে হয়। কিন্তু আমরা জানতাম না মসজিদের মিনারটা প্রাচীন। মিনারের পেটের ভিতর প্যাচানো চিকন একটা সিঁড়ি ছিল। উঁচু উঁচু ধাপ। আমরা সেই সিঁড়ি বেয়ে মিনারের মাথায় উঠতাম। আজান দেওয়ার মাইকগুলি পরীক্ষা করতাম। মোতালেব কলোনির ধূসর ছাদগুলি পরীক্ষা করতাম। আমাদের ভিতর উচ্চতাভীতি তৈরি হতো। বেশিক্ষণ মিনারের মাথায় দাঁড়াতে পারতাম না। তাও নামতাম না।

আমরা হাফিজাবানুর বড় ছেলের কাছ থেকে পরে শুনেছি, পরীবাগের শাহ সাহেব ছিল ঢাকার নবাবদের সহিস। এই গৌণ পদে বলবৎ থাকা অবস্থাতেই ওনার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। নবাবরা ওনার সম্মানে একটা ছোট জায়গা ছেড়ে দেয় পরীবাগ মসজিদের পেছনদিকে, যেখানে পরবর্তীতে ওনার কবর আর মাযার হয়। এই মাযার হওয়া নিয়ে প্রথমে নবাবদের আপত্তি ছিল। যদিও এক পর্যায়ে ওনারা মেনে নেয়। শাহ সাহেব নামাজ পড়তো পরীবাগ মসজিদে। লালবাগের পরীবিবি এই মসজিদ বানানোর হুকুম দ্যায়। ওনার নাম থেকে পরীবাগ। লালবাগ কেল্লার ভিতর পরীবিবির কবর আছে।

আশির দশকে এইসব ঐতিহাসিক যোগসূত্র আমাদের মাথায় ছিল না। আমাদের ইতিহাসবোধ একটা অবর্তমান পুল এবং কিছু ভূতপূর্ব হাতির ভিতর সীমাবদ্ধ ছিল। আমরা মসজিদ থেকে ফিরে ১৪৬ এর তিনতলার ছাদে উঠতাম। ছাদ থেকে, যেখানে পুলটা থাকার কথা, সেই হাতিরপুল বাজারের চৌরাস্তার মোড় পর্যবেক্ষণ করতাম।

তখন হাতিরপুলে কোনো উঁচু দালান ছিল না। ফৃ স্কুল স্ট্রিটের মাথায় শতাব্দী হোটেলের জায়গায় একটা টিনের ছাপড়া ছিল। ছাপড়ার ভিতর মশলাভাঙার কল। ঘটর ঘটর শব্দে বেল্ট ঘুরতো। মশলার ঝাঁঝালো বাতাস ছড়িয়ে পড়তো চারপাশে। ১৪৬ এর তিনতলার ছাদ থেকে পূবদিকে অনেক গাছ দেখা যেত। আমরা চিনতে পারতাম না যে সেটা রমনা পার্ক। সরাসরি নিচে তাকালে বড় একটা চাল দেখা যেত। আমরা চিনতে পারতাম যে সেটা মসলাকলের চাল। আশপাশের দালান থেকে নিষ্কাশিত অদরকারি জিনিস রোদ-বৃষ্টিতে ওই চালের অংশে পরিণত হয়। আমরা হাতিরপুলবাসীদের ফেলে দেয়া জিনিসগুলি এত দূর থেকে ভাল মত পরীক্ষা করতে পারি না। ছাদের উত্তরদিকে আমগাছে কাকের বাসা ভাল মত পরীক্ষা করতে পারি। নিচে নুরুমিয়ার পাকঘর আমাদের মধ্যে উচ্চতাভীতি তৈরি করে। আমরা বেশিক্ষণ সেদিকে তাকাতে পারি না। তবু প্রায় প্রায় তাকাই।

free_schoo_street

১৪৬ এর পূব পাশের ফৃ স্কুল স্ট্রিটের একাংশ, ২০১৫

লাল ছায়াটা ধীরে ধীরে তরুনানার গলি ঢেকে ফেলছিল। আমি নিচ থেকে বুয়াদের বাক্যালাপ শুনতে পাই। ওনারা দোতলা তিনতলা চারতলার জানলা থেকে বলাবলি করে ছায়াটা ঠিক ঠাক তৈরি হচ্ছে কিনা।

একশ ছিচল্লিশের পূবপাশে ফৃ স্কুল স্ট্রিট, পশ্চিমপাশে তরুনানার গলি। গলির মুখে বিশ পঁচিশজন মানুষ জটলা করছিল। ওখানে এক ম্যাজিশিয়ান যাদু দেখাবে। উনি একটা চকির উপর উপবিষ্ট হয়। আমি সামনে দাঁড়ানো।

ম্যাজিশিয়ান চকির অন্যপ্রান্তে যায় এবং যাদু দেখানোর বদলে নামাজ পড়তে আরম্ভ করে। এক সময় উনি আমার পিছনে চলে আসে। দোয়া পড়তে পড়তে ঘাড়ে হাত রাখে। সবাই হাসতে থাকে। আমি ওনাকে বলি- “আপনাকে তো আমি সরতে দেখলাম! এইটা কোনো ম্যাজিক হয় নাই”। সবাই হাসতে থাকে। তখন আমি হাফিজাবানুর ছোট ছেলের মাথা দেখতে পাই আবার। উনি ছাদ থেকে নিচে তাকিয়ে আছে।

এইসব রাতের বেলা ঘটে। প্রায় রাত রাত। যখন একটা রহস্যময় উজ্জ্বলতা চারিদিকে বিরাজমান ছিল। নাটকের সেটে যেমন থাকে।

*

৮৯-৯০ সালে হাতিরপুলে প্রায় প্রায় টায়ার পোড়ানো হতো। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস দিতো। ১৪৬ এর বারান্দায় কাঁদানে গ্যাসের শেল এসে পড়তো। ঝাঁঝ কমে যাওয়ার পর আমরা বারান্দায় বের হতাম। তোবড়ানো শেলগুলো আমাদের গোপন ল্যাবরেটরির জন্য সংগ্রহ করতাম।

কারফিউর সময় একদিন রাতের বেলা টহলরত বিডিআরের ট্রাকে কোনো এক অজ্ঞাত লোক ককটেল মারে। বিডিআর ভাবে বোমাটি ১৪৬ এর ছাদ থেকে তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে। তারা গেট ধাক্কিয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করলে হাফিজাবানু উপস্থিত পুরুষদের উত্তরের ঘরে যেতে বলে। পরে আমরা হাফবিল্ডিঙের বারান্দার রেলিঙে বসে দেখেছি হাফিজাবানু ও তার মেয়েরা সদর দরজা খুলে সবুজ হেলমেট পরা ৪-৫ জন ভদ্রলোকের সাথে কথা বলছে।

পরদিন মসলাকলের সামনে হরতালের সময় এক ভদ্রলোক আমাকে আটকায়। উনি রইছউদ্দীন সাহেবকে চিনতো – এই মর্মে মুখ হাসি হাসি করে অনেক কথা বলে এবং এক পর্যায়ে আমার হাফপ্যান্টের চেইনে হাত দেয়। আমি কিছু না বুঝে সরে আসি। ভদ্রলোক অমায়িক ভঙ্গিতে গল্প চালিয়ে যায় এবং একটু পর আবার হাত বাড়ায়। আমি ওনার হাতে খামচি দেই। উনি নিচু গলায় চিৎকার করে ওঠে।

পরে অনেককে বলাবলি করতে শুনেছি হাতিরপুলে এক ব্যক্তি আছে ছোট ছেলেদের সাথে রাস্তাঘাটে গল্প করে। আরো শুনেছি যে হাতিরপুলে ছেলেধরা আছে। অল্প বয়সী ছেলেদের ছালার বস্তা দিয়ে ধরে এবং হাত পা ভেঙে লুলা বানায় ভিক্ষার কাজে লাগিয়ে দেয়।

মিশুক ভদ্রলোক এবং সম্ভাব্য ছেলেধরা আমাদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। আমরা দুপুরবেলা একা একা চলাফেরার সময় আলাদা উত্তেজনা অনুভব করতে শুরু করি।

সেন্ট্রালরোডের মাথায় কসাইয়ের দোকান। আমরা ওখানে থরে থরে সাজানো গোশতের উপর বসে থাকা মাছি পরীক্ষা করতাম। নুরুমিয়া বলতো হাতিরপুলে একমাত্র ওনাকেই কসাইরা মাপে ভুল দেয় না; দাড়িপাল্লার নিচে লুকানো পাথর খুলে রাখে। হাতিরপুলের কসাইরা আমাদের দেখলে হাসিমুখে কথা বলতে চাইতো। পান মুখে হাসতো। আমাদের খারাপ লাগতো না। ওনাদেরকে খারাপ না লাগাটাকে আমরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তার অংশ বলে মনে করতাম।

হরতালের দিন, কিংবা যখন হরতাল থাকতো না, কারফিউও থাকতো না, সেরকম সময় ১৪৬ নং হাতিরপুলের সামনে রাস্তার উপর আখের রস বিক্রি হতো। লোহার চাপে ছোবড়া থেকে রস আলদা হয়। এই রস-কলের সামনে একদিন আমরা এক কোপ খাওয়া ভদ্রলোককে দেখি। ওনার বাম কাঁধ থেকে গলগলিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। উনি সেই অবস্থায় রিকশা রিকশা বলে চিৎকার করতে থাকে। কোনো রিকশা থামে না। উনি বাজারের মোড় পর্যন্ত দৌড়ে যায় এবং একটা বেবিতে ওঠে।

১৪৬ নং হাতিরপুলে প্রায় প্রায় মিলাদ হতো। রইছউদ্দীন খানের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন নুরুমিয়া উঠানে লাকড়ির চুলা ধরিয়ে বড় ডেকচিতে গরুর মাংস রান্না করে। লাকড়িপোড়া ধোঁয়া উপরে আমগাছের ডালে পৌছে যায়। কাকগুলি কয়লা এবং মসলার মিশ্র গন্ধে কা কা করে। আছরের নামাজের পর প্যান্ডেল টাঙিয়ে মিলাদ হয়। মহিলারা হাফবিল্ডিঙের ভিতর।

মাদ্রাসা থেকে হুজুর আসে। মিলাদ চলাকালীন সময় গোলাপজল ছিটাতে ছিটাতে আমরা লক্ষ্য করি হুজুরের গালে পানি।

আমরা বুঝতে পারিনা ওইটা গোলাপজল নাকি অশ্রু। অশ্রু হলে হুজুর কি নবীর কথা ভেবে কাঁদছে নাকি রইছউদ্দীন সাহেবের কথা। মিলাদ শেষে হুজুরকে কয়েক প্যাকেট মিষ্টি বেশি দেয়া হয়।

নবীকে সালাম জানানোর ওই মিলাদের অনুষ্ঠান আমাদের মনে দাগ কাটতো। মনে হতো কেবল মিলাদ হলেই নবীকে ঠিকমতো সালাম দেওয়া যায়। এছাড়া যায় না।

এক বছর মিলাদ ভাঙতে ভাঙতে অন্ধকার হয়ে যায়। মাগরিবের আজান দিয়ে দেয়। আমরা আলাউদ্দিনের মিষ্টির বাক্স হাতে এই বাসা ওই বাসা করি। নবীকে সালাম জানানোর আবেগ মনের ভিতর উথাল পাথাল করে। একই সাথে প্রতিবার মিলাদ পড়ানোর সময় হুজুর কেন কাঁদে সেই কথাও মনে হতে থাকে। সন্ধ্যাবেলা আবছা অন্ধকারে আমাদের শাদা পাঞ্জাবি দূর থেকে মনে হয় নীল।

ওইদিন বৃষ্টি পড়ে সব জায়গা পিছল হয়ে ছিল। উত্তরের আমগাছে কাকগুলি অস্থিরভাবে ওড়াউড়ি করছিল। আমরা কোনো এক অজানা কারণে ভয় পেতে শুরু করি। মনে হয় অন্ধকার দু’ভাগ করে কেউ এসে পেছন থেকে ধরবে আমাদের।

ওই সন্ধ্যায় আমগাছে কাকের বাসা খুঁজতে গিয়ে আমরা বিশাল একটা মৌচাক আবিষ্কার করেছিলাম। আড়াআড়ি ডাল থেকে মৌচাক নীরবে ঝুলে আছে ঠিক আমাদের মাথার কয়েক হাত উপরে। এত কাছে এত পোকা দেখে আমাদের গা গুলিয়ে ওঠে। আমরা কলপাড়ের দিকে সরে আসি। কিন্তু চলে যাই না। পোকা দেখতে থাকি।

...

মেসবা আলম অর্ঘ্যমেসবা আলম অর্ঘ্য

কবি ও গদ্যকার

Leave a comment

Filed under সারথি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s