তানিমরে আমার খুন করতে মন চায় / খেয়া মেজবা

Bikash Bhattacharjee

সকালবেলাটা অসহ্য যন্ত্রণার। অসহায়, ফাঁকা আর অস্বস্তিকর ভীষণ। নিজেকেই একটা আস্ত empty space বলে মনে হয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে নিজেকে ভরতে শুরু করি। প্রথমে ক্লান্তিকর ঘুমের মধ্যে ঘুরে আসা জায়গাগুলার কথা ভাবি। স্বপ্নের ভেতর সেইসব ঘটনা, মানুষ— তাদেরকেই ভাবি। খুবই খুশির ব্যাপার এই যে, আমি রাজবাড়িতেই আবার রয়ে গেছি আমার স্বপ্নে। জন্মের পর থেকে আমার দাদীকে দেখতাম মাথায় মেন্দী দিতে। আসলে পুরোপুরি ঠিক তা না। জন্মের বহুকাল পর পর্যন্ত তাকে আমি দেখি নাই, দেখছি আরো খানিকটা বুদ্ধি হওয়ার পরে। সেইদিন দেখলাম, লম্বা এক টেবিলের উপর দাদী তার চুল এলায়ে রাখছে, আর আমি তার চুলে মেন্দী লাগায় দিতেছি। কী লম্বা আর ঘন ছিল সেই চুল! শীতকালের সোনালী আলোতে চুলগুলি চকচক করতেছিল! আমার খুব আনন্দ হইতেছিল দেখতে। কিন্তু দাদীর চুল তো অতো লম্বা ছিল না কখনোই! মনে পড়ে না। এইসব ভাবতে ভাবতে আধো ঘুমে আরো যন্ত্রণা হইতে শুরু করে। এবং একসময় আবার ঘুমায় পড়ি আমি।

তারপর আবার দেখি সেই পুরনো বাড়ির দেয়ালটাকে। তাকে ঘেঁষে দাঁড়ায় আছে একটা মিটসেফ। মিটসেফের ভেতর রান্না করে রাখা তরকারিগুলা। বয়সের ভারে সেই মিটশেল্ফ তারচাইতেও পুরানো দেয়ালটাতে হেলান দিয়ে পড়ে থাকতে চায়। জীবনের প্রতি, বেঁচে থাকার প্রতি তার কোনোরকমের আগ্রহ আর ছিল না যেন। কেমন একটা করুণ সুর মিটসেফের চারপাশের বাতাসে ঘোরাফেরা করে, আমি কান পেতে শুনি। সেই মিটসেফটার পাশে দাঁড়ায়ে আমি দেখতেছিলাম কী কী রান্না হইছে। রান্না করছেন আমার বড় খালা, উনাকে তো দেখা যায় নাই স্বপ্নে! শুধু তার রান্নাগুলা দেখে স্বপ্নের ভেতরেই আমার কান্না পায়। শেষবার উনি যখন আসছিলেন আমাদের বাসায়, বাড়ি ফেরার সময় আমাকে দুনিয়ার অবাক করে দিয়ে জড়ায়ে ধরে কানছিলেন। হায়রে ভালোবাসা! এই মানুষগুলা যে ক্যান আমারে এতো ভালোবাসে। স্বপ্নের মধ্যেই তার জন্য মায়া হয়, দেখতে ইচ্ছা হয়, ধরতে ইচ্ছা হয়।

একসময় মনে হয় ভূমিকম্প হচ্ছে। ওই বাড়ি নিয়ে আমার খুব ভয় ছিল। এতোই পুরানো আর জীর্ণ ছিল তার দেওয়ালগুলি যে— যেকোন বাতাসেই ভেঙে পড়ার কথা ছিল বলে মনে হতো। কিন্তু পড়ে নাই, এমনকি এখন পর্যন্ত, যখন আমি একেই স্বপ্নে দেখতেছি। কিন্তু স্বপ্ন তো আমার ধারণার বাইরে যেতে পারে নাই। মনের ভেতরের জমে থাকা আশংকাই স্বপ্নে এসে হাজির হলো।

ঘুম ভাঙতে শুরু করে আমার। চোখ খুলতেই প্রথম চোখ আটকায় দেয়ালের পেইন্টিংটাতে। দেখি ওটা দুলতেছে। সেই দুলুনি দেখতে দেখতে আবার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। চোখের পাতা ক্লান্তিতে ভার হয়ে আসে, আর তাকাতে ইচ্ছে হয় না। বাইরের রোদের আলো অনেক অনেক পথ পার হয়ে, অনেকগুলা দেয়াল ফাঁকি দিয়ে অল্প কিছুটা আমার ঘরে ফেলে। তারপরেও আমার জেগে থাকতে ইচ্ছে করে না, আবার ঘুমায় পড়ি আমি…

অনেক্ষণ ধরে ঘুমের ভিতর এইসব হতে থাকে। তারপর অবশ হয়ে আসতে থাকা শরীর আর কিছুতেই কাজ করে না। নিজেকে সবটুকু শক্তি দিয়ে ঠেলে উঠানোর চেষ্টা করতেই মনে হয় সবকিছু আবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে। শরীরের সমস্ত মাংশপেশী ঝিম ঝিম করতে থাকে। রক্ত যেন হিম ঠাণ্ডা। মনে হয় যেন একটা বিল… বিলের মধ্যে অজস্র শাপলা ফুল আর পাশ বেয়ে কলমির লতা, কচু পাতার শিশির আরো যেন কী কী সব। এরমধ্যে ডুবে যেতে থাকি আমি। ডুব দেওয়া মাত্রই আরেক পৃথিবী দেখা যায়। কেমন সুররিয়্যাল লাগে সবকিছু, বিকাশের পেইন্টিঙের মতো স্যাঁতস্যাঁতে এক দুনিয়া।

আমি বুঝি না আমি আসলে ঘুমায় আছি নাকি জেগে। ঘুমের ভেতরেই মনে স্পষ্ট মনে হতে থাকে ফোনে ফেসবুক হোমপেজ ঘাটতেছি শুয়ে শুয়ে। তাইলে কি আসলে জেগে আছি? বুঝতে পারি না। কেমন ঘোরের মতো লাগে। নিজের সাথে যুদ্ধ করে চোখ খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। কিছুতেই শরীর আমাকে উঠে বসতে দিচ্ছে না। নিজেকে ঠেলে তুলতে তুলতে ক্লান্ত আমি। মনে হতে থাকে ফেসবুকের হোমপেজে তানিম যেন কী একটা অ্যালবাম আপ করছে। অ্যালবামের নাম ‘আমরা শরীর দেখাই’। কীরম বিচ্ছিরি সব ছবি। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার মতো এই দুপুরের দিকেও। আবছা অন্ধকারে সবকিছু এলোমেলো লাগে। পিসিটা চলে এখনো, স্লিপ মোডে যায় নাই। মানে খুব বেশি সময় হয় নাই। কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখতে পাইতেছি সে অফিসে বসে এইসব আপ করতেছে। এটা সে কিভাবে করতে পারে! তার তো পারার কথা না। উফ! অসহ্য! আমি তার কাছে জানতে চাই এটা তুমি কী করলা? এইসব কেন দিতেছো! ছবির লিঙ্কসহ দিতে চাই। কিন্তু পারি না। আমি তো নিজেরে উঠাইতেই পারতেছি না। আবার আপ্রাণ চোখ খোলার চেষ্টা করি। নিজেকে কোনোভাবেই ঠিক ইনফর্মেশন দিতে পারি না যে আমি স্বপ্নে আছি না বাস্তবে। আবছাভাবে চোখ খুললেও এইসব দেখতেছি। অস্থির লাগে। উঠে বসার চেষ্টা করে ক্লান্ত হয়ে আবার ডুবে যেতে থাকি। অ্যালবামে ততোক্ষণে বেশ লাইক কমেন্টের হিরিক। অসহ্য লাগে আমার। খুন করে ফেলতে ইচ্ছা করে। আহ! কী বিভীষিকা। তানিমরে আবার লিঙ্কটা দেওয়ার চেষ্টা করি, পারি না। রাগে দুঃখে  বোধয় আবার ঘুমায় পড়ি। আমার ঘুম ভাঙতে মন চায় না, কয়টা বাজে দেখতে মন চায় না, খাইতে মন চায় না। কিছুই ভাল্লাগে না। পেটের মধ্যের বাচ্চাটার জন্য চিন্তা হয় খালি। এই বেচারা ক্যামনে না খায়ে থাকে আমার সাথে। কী অশান্তি।

ঘুমাইতেই ভাল্লাগে। আমি ঘুমাই। মাইকে আযান শোনা যায়, জোহরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। খুব বেশি দেরি হয় নাই এই ভেবে আবার ঘুমায় পড়ি। আরো কতো কী স্বপ্ন দেখি। তবুও আগের সেই স্বপ্নের জ্বালা আমার দূর হয় না। তানিমরে আমার খুন করতে মন চায়। ঘুমের ভিতরেই মুখে থুতু জমতে থাকে রাগের চোটে।

কাথার নিচে কী যেন একটা নড়াচড়া করে ওঠে। চমকায় উঠি আমি। সাথে সাথেই বুঝি তেলাপোকা। একটা লাত্থি দেওয়ার চেষ্টা করি যথাসম্ভব স্থানে। হারামজাদা কই যেন গায়েব হয়ে যায়। ওর পেটেও কি বাচ্চা আছে? জানতে মন চায় আমার। তেলাপোকার পেটের বাচ্চার কথা ভাবতে ভাবতে ফোনটা হাতে নেই। মুহূর্তেই মনে পড়ে সেই ঘটনা। রাগ জমতেছে ভেতরে। হোমপেজের প্রথমেই চোখে পড়ে তানিম প্রোফাইল পিকচার বদলাইছে, অনেক আগের কোন এক ছবি। রাগ বাড়ে আমার, এতো পুরান ছবি ক্যান দিলো ওর ঘাড় মটকায়ে জানতে ইচ্ছা করে। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে ওর ম্যাসেজের উত্তর দিতে থাকি।

-কী করো?

-ঘুমাইছিলাম।

-খাইছো দুপুরে?

-না, তুমি?

-সময় পাই নাই এখনো, হাতে কাজ অনেক। এতো ব্যালা পর্যন্ত না খায়ে থাকা ঠিক না তোমার।

কথার জবাব দিতে ইচ্ছা করে না আমার। অন্যপাশ ফিরে শুই।

শাঁখারিবাজারের সেই বাড়িটার কথা মনে পড়ে। সেই প্রথম বোধয় আমি ভিতরে পানিসহ কুয়া দেখছিলাম। স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল, শ্যাওলাধরা অব্যবহৃত জায়গাগুলা। শুধু যেটুকুর মধ্যে হাঁটা-চলাফেরা হয় সেই জায়গায় তেমন শ্যাওলা ছিল না কিন্তু পিছলা, কেমন একটা রঙ সেই সিমেন্টের। অনেক রকম রঙ চোখের সামনে ভাসতে থাকে। স্যাপ গ্রিন, প্রুশিয়ান ব্লু, বার্ন্ট সিনা। এই রঙগুলা আমার খুব প্রিয়। যেমন প্রিয় এই শ্যাওলাধরা নোনা দেওয়াল, সিমেন্ট। এই বাড়িটাতে ঢুকেই আমার এমন এক উপন্যাসের কথা মনে হইছিল যা আমি কোনোদিন পড়ছিলাম না কিন্তু বহুবার পড়া আপন কোনো জায়গার মতো। ইলিয়াসের কোন গল্পে, পুরান ঢাকার কোন বাড়ির মতো লাগে একে। বাড়িটা ঠিক এমন ছিল যে খালি উপর থেকে গোলমতো একটা জায়গা দিয়েই আলো পড়তো কুয়ার ওপরে। শীতকালের সেই সকালের নরম আলো আর খসখসে সিমেন্টের গায়ে চকচকে রিফ্লেকশনের উপর দিয়ে আমি হাঁটতেছিলাম। কেও ছিল কি সেই সময় আমার সাথে? ওই বাড়িতে কি আমি তানিমরে নিয়ে গেছিলাম? এখন মনে পড়তেছে না। মনে না পড়াই ভালো হইছে। এখন তাকে আমার সহ্য হচ্ছে না, কোথাওই তাকে না নিয়ে যাওয়া ভালো হইছে এমন ভাবি আমি। একটা সুরঙ্গের মতো পথ দিয়ে বাড়ির দোতলায় উঠে ছবি তুলছিলাম মনে পড়ে। এই বাড়িটা এমনই যে বের হলে আরেক দুনিয়ায় চলে আসছি লাগে।

অবশ্য একটা কুয়া তো আমাদের রাজবাড়ীর বাড়িতেও ছিল। ছোটবেলায় আসলে অনেকগুলি বাড়িতে থাকছি আমরা। যখন যেখানে থাকতে সুবিধা হইছে, আমরা সেইখানেই থাকছি। কুয়াটা ছিল সালাম মিয়ার বাড়ি বলে যেই বাড়িটা আমার নানি আমাদেরকে থাকতে দিছিলো, সেইখানে। ছোটবেলায় শুনছি যুদ্ধের সময় নাকি এই কুয়ার ভেতরে মানুষ মেরে ফেলা হতো। মাটি দিয়ে ঢাকা সেই কুয়ার ভেতর একটা পেয়ারা গাছ পোঁতা ছিল। কোনোদিন সেই পেয়ারা খাইছি বলে এখন আর মনে আসে না। আমার কি স্মৃতি হাতরানোর সময় আসলো? ক্যান সব ভালো মতো মনে পড়ে না এখন? এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাইতেছি নিমিষেই। ভালো লাগে না কিছুই।

দুপুর গাঢ় থেকে গাঢ় হয়। আমি ঠিক জানি সূর্যের রঙ বদলাইতেছে, আলোগুলার রকম বদল হইতেছে কিন্তু আমার ঘর থেকে এইসবের কিছুই দেখা যায় না। খালি আমাদের বারান্দা ঘেঁষা নতুন ফ্রেমের মতো সদ্য বিল্ডিঙটায় মিস্তিরিদের কাজের শব্দ পাওয়া যায়।

গান শুনতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু উঠতে হবে ভাইবে ইচ্ছাটা আর গুঁতায় না আমারে। এইটাই ভালো, এইভাবে পড়ে থাকবো সারাদিন, তাতে আমার খারাপ লাগে না। খালি বুকটা ফাঁকা লাগে। কোনো নির্দিষ্ট কষ্টবোধ হয় না কিন্তু ব্যথা হয় ঠিকই। আর খালি বাচ্চাটা, যে কিনা আমার পেটের ভিতর বাড়তেছে তার খিদা নিয়ে চিন্তা হয়।

সালাম মিয়ার বাড়ির শীতকালের কথাই আমার মনে পড়ে বেশি। আর যেই বাড়িটা ছিল আমার দাদা বাড়ি, যেইখানে আমরা গিয়ে উঠি আরো অনেক পরে, সেইখানে স্মৃতি গভীর হয়ে আছে বর্ষাকালের। সালাম মিয়ার বাড়িতে আমার লাগানো তেমন কোনো গাছ ছিল না। বরইতলার নিচে টিনের ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে একটা মাধবীলতা পুঁতছিলাম। এই গাছটাই আমাকে সবচেয়ে যন্ত্রণা দেয়। ওকে আমি ভালোবাসতাম। এই ভালোবাসাটা আসলে ঠিক কী কারণে আমি জানি না। হয়তো গাছ প্রজাতির মধ্যে এ-ই আমাকে সবচেয়ে বেশি আহত করছিল, হয়তো তাই। কেমন মায়াও লাগে। এই বাড়িতে আমাদের থাকা-থাকির মেয়াদ খুব বেশি ছিল না। কিন্তু আমার কাছে উল্লেখযোগ্য ছিল। এই বাড়িতেই প্রথম আমি শিখি আম্মার অবাধ্য হতে, তার সাথে ঝাড়ি দিয়ে কথা বলতে।

আমার দাদী যখন মনস্থির করছিল আমরা তার সাথে এক বাড়িতেই থাকতে পারি তখন সালাম মিয়ার বাড়ি ছাড়তে হইছিল আমাদের। আম্মার জীবনে মনে হয় খুবই সুখের সময় ছিল সেটা। এই সামান্য আধা ভাঙ্গা-চোরা বাড়িটার জন্য কারো মায়া হইছিল না বোধয়। কিন্তু আমার মন খারাপ হইছিল সবচেয়ে বেশি গাছটার জন্য। তখনো তার ফুল ফুটে নাই। গাছটা তরতর কইরে বেড়ে উঠছিল, এতোটাই উঁচুতে ছিল এর চূড়া যে ঘাড় অনেকখানি উঁচায়ে দেখতে হইতো। অল্প কিছু কুঁড়িও হইছিল কিন্তু তখনো পর্যন্ত ফুল ধরে নাই। এই বাড়ি ছাড়া প্রসঙ্গে আমার কোনো উত্তেজনা ছিল না। বিকালবেলায় কাঁচা লাল ইটের রাস্তায় আমার লাল সাইকেলটা আর ঘুরবে না তাই নিয়ে মন খারাপ ছিল অবশ্য। আরো তো কতোকিছুই ঝুলে থাকে দেওয়ালে স্মৃতি হয়ে যেইগুলা ভাইবে মন খারাপ হয়, হয়ই-তো। ভাবি আমি।

আর্টওয়ার্ক : Bikash Bhattacharjee The Love Trap Medium – Mixed media on paper Year – 1984

...

খেয়া মেজবাখেয়া মেজবা
গ্রাফিক ডিজাইনার ।

1 Comment

Filed under সারথি

One response to “তানিমরে আমার খুন করতে মন চায় / খেয়া মেজবা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s