অর্জুনের প্রাণিজগৎ

[অর্জুন, কোচবিহারে থাকে। কবিতা, গদ্য লেখে। সম্পাদনা করে। ওঁর একটা লেখার জন্য লাল জীপের অপেক্ষা ছিলো ২ বছরের মত। অবশেষে পাওয়া গেলো। অর্জুনকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কেমন আছেন?’ জবাব এলো, ‘এখনো বেঁচে আছি!’ আমরা বলতে চাই, বেঁচে থাকতেই হবে অর্জুন, অনেক অনেক দিন…]

arjun 2

ভূমিকা গদ্য

অর্জুন বন্দোপাধ্যায়

এখন যে কবিতাগুলো লেখার চেষ্টা করছি…

arjun
রিনি, মানে নীলাঞ্জনা এসছিল আমার এখানে এপ্রিল মাসে। ওর বর, অভিষেককেও নিয়ে এসছিল তখন। কোচবিহার রাজবাড়ির মিউজিয়ামটায় নিয়ে গেছি ওদের একদিন। দুপুর তখন। আমারও যাওয়া হ’ল অনেক বছর বাদে। ৮-১০টা ঘরই মাত্র খোলা আছে তখন দেখলাম। বাকি সব জায়গায় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়ার কাজ চলছে। তো, একটা ঘরে আমরা একাদশ-দ্বাদশ শতকের পাথরের মূর্তিগুলো দেখছি। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, অষ্টাদশ-দশম শতকের পাথরের মূর্তিগুলোর পাথরের যে রঙ, যে নক্‌শা— একাদশ-দ্বাদশে এসে তা বদলে গেছে। সূক্ষ্মতা যোগ হয়েছে আরও। ডিটেইলিং বেড়েছে। যাই হোক, তো একাদশ-দ্বাদশ শতকের একটি নারায়ণী মূর্তির সামনে দেখি রিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। ঠায়। আমার তখন শরীর বেশ খারাপ। এতো হাঁটাহাঁটিতে কাহিল হয়ে গার্ডের চেয়ারটা দখল ক’রে বসেছিলাম। রিনিই আমায় ডেকে দেখালো জিনিসটা। দ্যাখ্‌ অর্জুন, এই মূর্তিটার বেশ কিছু জায়গা ভাঙা। মুখের কাছে, হাতের কিছু জায়গা। পায়ের ওখানেও। ভাঙা। এটা যেন কবিতা হয়ে উঠেছে। ওই ভাঙা জায়গাগুলোতে আমি আমার মনের মতো ভাবনার অংশ জুড়ে দিতে পারছি। একটা যেন শূন্যস্থান রেখে দিয়েছে কেউ এতো বছর আগের এই কাজটায়, আমি এসে তা’ পূরণ করব ব’লে। এই পাথরের মূর্তিটা তাহলে আমিও বানিয়েছি কিছুটা, বল?

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

আমার এখনকার এই ছবিগুলো, এগুলো ক্যারেক্টার স্কেচ অন মাই পয়েন্ট অফ ভিউ। পোট্রেট নয়। আঁকতে গিয়ে বুঝতে পারছি, যার ছবি আঁকছি, আসলে তাকে নিয়ে একটা গল্প বা চিঠি লিখছি যেন আমি। সেটা করতে গিয়ে তাকে আরো অনেকটা খুঁটিয়ে জানতে পারছি। এখন আমি জানি বারীনদার ভ্রু-র ভাঁজ কেমন। দেবাদৃতার চোখের নীচের কোল বা উড়ন্ত এলোমেলো চুলগুলো কেমন ও কতটা। পোট্রেটে পুরোটা বলে দেওয়া থাকে। হুবহু ফোটোকপির মতো। আমরা কবিতায় ঠিক যে কারণে সব কথা বলি না, এও তাই-ই। কত কম রেখায় আমি একটা মুখের / মানুষের চরিত্রের মূল দিকগুলো ফোটাতে পারি, তার একটা চেষ্টা। অর্ক যেমন বারীনদার ছবিটা দেখে বলছিল, মিনিমালিজমের কথা। একদমই তাই। ঠিক যেমন কবিতা লেখার সময় ভাবি, কত কম শব্দে পুরোটাকে ধরবো। তাই, হুবহু দেখতে হওয়া-টুকুই আমি চাইছি না। চরিত্রটি যেহেতু বাস্তবে হেঁটে চলে বেড়ানো একজন মানুষ, তাই আমার ছবির সাথে তার রূপগত সাদৃশ্য থাকা অবশ্যই জরুরি, যতটা বিশ্বাস-যোগ্যতার জন্য প্রয়োজন। এবারে, চোখ, চোখের ভাঁজ, মণি, ঠোঁট (অধর, ওষ্ঠ— এঁরা দুজন আলাদা ব্যক্তি। আলাদা খবর, আলাদা ইনফরমেশন সরবরাহ করেন এনারা), গালের / কপালের রেখা, এগুলো একটি মুখের ভীষণ ভাইটাল জায়গা। প্রায় সব কথাই বলে দেয় এরা। একটি মুখ সম্পর্কে এরা প্রায় সবটা জানে। তাই এদেরকে দিয়ে সেই মুখ সম্পর্কে কথা বলিয়ে নেওয়াটা সহজ। কিন্তু মুখের বাকি জিনিসগুলো কি কিছুই জানে না! তা তো নয়। তাদেরকে দিয়ে কতটা কী বলিয়ে নিতে পারি আমি সেই মানুষটি সম্পর্কে, সেই মুখটি সম্পর্কে, সেটাই দেখতে চাইছি। আবার, কবিতা যেমন বাস্তবের হুবহু বর্ণনা দেয় না। সেটা কবিতার কাজ নয়। উদ্দেশ্যও নয়। ওটা খবরের কাগজের রিপোর্টের কাজ। ছবিও তেমনি। রেখাও তাই-ই। নিজের হুবহু ছবি পাসপোর্ট ফোটোতেই পাওয়া যায় বোধয়। কেননা সেখানে কবিতা নেই। রেখার মজা এখানেই। সুমনের ছবি যেমন, medium point পেন্সিলে করা। আবার বারীনদার ছবি, fine chisel পেন্সিলে। দেবাদৃতার ছবি fine chisel, fine point, medium point মিশিয়ে। যে ধরনের ঘনত্ব-পূর্ণ রেখায়, চরিত্রের / মুখের যে বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটিয়ে তোলা যায়, সেই মতো ক’রে।

অনেকে আমার কাছে চাইছেন তাঁর ছবিটি এঁকে দেওয়ার জন্য। আমি সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী, কেননা, একেবারে অপরিচিতের মুখ আমি আঁকতে পারব না। কেন পারব না? ঐ যে বললাম, যার ছবি আঁকছি, আসলে তাকে নিয়ে একটা গল্প বা চিঠি লিখছি যেন আমি। আপনাকে নিয়ে একটি গল্প লিখতে হলে তো আমার আপনাকে খুব ভালো ক’রে জানতে হবে। এবং পরিচিত বা জানলেই তো হবে না। আমরা কি সব জানা জিনিস নিয়ে বা সব পরিচিত মানুষকে নিয়ে গল্প লিখি? না লিখতে পারি?

এবারে মজার কথায় আসি। প্রায় আট-ন’ বছর বাদে হঠাৎ কি জানি কি খেয়াল হ’ল (ঠুমরী কেন যে হয় না) আবার ছবি নিয়ে বসি। ‘আবার’। কি অমোঘ এই শব্দ, ‘আবার’। আর্যনীলদা বছর তিনেক আগে একবার লিখেছিলেন আমায়, ‘”আবার’ এমন এক পুনর্চক্রের শব্দ যা অশ্বমেধের ঘোড়াকে প্রজ্ঞায় মেধায় আরো যুবনাশ্ব করে ফেরায়।’ এই গত প্রায় ন’ বছরে আমি ছবির জন্য কিছুই করিনি। ফলে, ছবি নিয়ে আজ নতুন ক’রে ব’সে টের পাচ্ছি, কনফিডেন্স লেভেল ভোগে গেছে অনেকটাই। ঘরের ক্যানভাস এ্যাতোদিন ধ’রে ঝুল মেখে দাঁড়িয়ে। ইদানীং, যে প্রচণ্ড ডিপ্রেশনের ভেতর চলেছি, তাতে না পারছি একটা লাইনও কিছু লিখতে, বা অনুবাদ করতে, কিম্বা পড়তে। যে ক’টা বই চেষ্টা করলাম পড়ার, একটিও অর্ধেকও পড়ে উঠতে পারিনি। কিন্তু উপায় তো নিজেকেই বের করতে হয়। এবারে ছবির সাহায্য নিলাম। আরো ভালো ক’রে বললে, রেখার সাহায্য নিলাম। খুব মন দিয়ে স্টাডি করছি বিভিন্ন রকম রেখা নিয়ে, ভালো লাগছে। যতদিন বা যতক্ষণ এই খেয়াল থাকবে, আঁকবো। আবার ঠুমরী শুরু হয়ে গেলে, খেয়ালও চলে যাবে। কে জানে, আজকেই আমার শেষ আঁকা কিনা, কিম্বা হয়তো কাল। আবার হয়তো আট-ন’বছর পরে বসবো। হতেও পারে। না-ও হতে পারে। যতক্ষণ এঞ্জয় করছি। আঁকবো। লেখালিখি ছাড়া আমার জীবনে এখন অব্দি আর কোনো কিছুতে আমি আমার কনসিস্টেন্সি দেখিনি। তাই, এগুলো সবই মূল নদীর শাখা নদী ভাবা যেতে পারে।

অর্জুনের প্রাণিজগৎ

মানুষ

manush

গানওলা

ganwala

মিছিল

‘একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে
সারা শহর উথাল-পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে’

আমি জানতাম না আগে, একটু আগে একজনের পোস্টে জানলাম। মানে ঘটনাটির তারিখটি জানা ছিল না। আজ ২৫শে জুন এ’ দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত ঐতিহাসিক একটি দিন। ‘৭৫ সালে আজকেই স্বাধীন গণ-প্রজাতান্ত্রিক ভারত রাষ্ট্রের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাননীয়া শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী মহোদয়া ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করেছিলেন। দিন-ক্ষণ না জেনেই আজ ভোরে এই ছবিটা এঁকেছি। দিন-ক্ষণ মিলে গেলো।

michil

বারীন দা

barinda

নবারুণ সিরিজ ১

nobarun 1

নবারুণ সিরিজ ২

nobarun sirij 2

নবারুণ সিরিজ ৩

nobarun sirij 3

দেবাদৃতা

debadrita

মুড়ো

muroমুখোমুখি

mukhomukhi

নগরে বাউল

nogore baulনবারুণ ও ঋত্বিক

nobarun o rittik

নবারুণ ও দণ্ডবায়স

nobarun o dondo bayosh

নবারুণ সিরিজ ৬

nobarun 6

নবারুণ সিরিজ ৭

nobarun 7

অর্জুনের প্রাণিজগতে আপনাকে স্বাগতম উস্তাদ

1 Comment

Filed under সারথি

One response to “অর্জুনের প্রাণিজগৎ

  1. ভালো লাগল খুব

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s