কিশোর মাহমুদের গুচ্ছ কবিতা

A FANTASY WORLD MADE BY OLEG OPRISCO

সূর্যের বাজনা

গম্ভীর পাহাড়ের ভাঁজে পশু প্রেম শস্যের গান প্রাণ আঁকে, আগুন হুল্লোড়, পাথর নাচে উচ্ছ্বাসে, ওরা উড়বে জোছনায়, তারাখচিত ময়ূর ডানা ঝাপটায়, ঝরে রংধনু, মৃত্যুময় আনন্দে গান গায় ঘাস মগ্ন কবরে, জুয়াড়ির কররেখা জলে চালে জাহাজের গতি, কফিনে নাবিকের কঙ্কাল সমুদ্রশীর্ষে উড়ে যায়, শৈবালে জনপদের নকশা ছাপা ছিল, যারা গ্রহে গ্রহে গচ্ছিত রাখে উৎসব উত্তরপুরুষের

ধর্ম আফিমে, আঙুরক্ষেতে ঘুমিয়ে পড়েছে যে পশুজীবী, লাঙলফলায় গেঁথে দাও, রক্তলাভায় গলে যাক তীর্থভূমি, যে গোপনে পেতে রাখে কারাগার

রাস্তা, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ফেলে যাও যার কামনায় দোল খায় রাজকন্যার হিরাবরণ, গোপনে সে গোসল করে ঝরনায়, ছিটকে-আসা ফোঁটা দেহপূর্ণ তৃষ্ণায় কাঁপে, মাঝখানে সারি ইট ছায়াপথ পাড়ি দেয়, সোডিয়ামবিভ্রমে যৌথ প্রেমিকার পথে হাঁটি, আপেল ঝগড়া থেমে যায় দূরের ফ্ল্যাটে

তোর হাসির চাতুরিতে ফোটে ডিজেলফুল, তেলপাখির ছায়া, আমাদের অবিশ্বাস প্রেমে ছড়ায় সুবাস ক্লান্তির, যে স্থবির দালান, হয়রান পাখনার খোঁজে, অন্ধ ভিখারি লম্পট বিষাদ বোনে পালকে, পাহাড় ওড়ে মুগ্ধতায়, পশমে সূর্যের উল্লাস

হাসে ঝাড়লণ্ঠন নরকের আলো, স্বর্গীয় ইশারায় দূরে ভাসমান পার্লার, কৃত্রিম সংকেতে ডাকে, কত শতকের রূপ খসে পড়ে মশলার বনে, জলের ধার মাতালসংঘে বেটে দেয় ফালি চাঁদ, সুরা-শরাবের বাগিচায় দাস পৌরুষের বীর্য, শিকলের গিঁট খুলে ভাঙে বসনের তিক্ততা ঢেউ, আকাশপাড় দিগন্তে ভেজায় ফাঁসিকাঠ

ইশারার মায়াবি ভুলে, সৈকতে ফেলে গেছ হ্রেষাসংগীত, সে-মূর্ছনা বিস্মরণে কারিগর, গরাদের লোহা গেলে বানিয়েছে চাকা

উড়োজাহাজী, পারো স্থির ডানায় ভাঙো ভাসা বরফের চাক, কুচি শীতল শব্দে পান করি পুঁজ পচা মাংসের নদী, আর তোমরা গোসল করো আরব্য ঝরনায়, নিগ্রো শিশুর চোখে পোড়ে সভ্য সফলতা, যার ত্বকে শাদা ভবনের ছায়া

ঐ যে শাদা তুলা, সুতার বান্ডিল, তুষারের ভারে ঝরে, ঠাণ্ডা অশ্রুধারা মরুতে বোনে সমুদ্রবীজ, তাকে পুলসেরাত পার করে দাও, চুলে অনেক আগুনরাত ঝুলে আছে, ছেঁড়া পোশাকে চোখ পেতে দেখেছি মেদহীন উজ্জ্বলতা

কারখানাচাকাসূর্যমেশিন, ঘামসমুদ্র ডুব দিলে, পৃথিবী আলোর প্রপাতে হাসে, অবিরাম ব্যস্ত কাজে, চাঁদবুড়ির চোখ থেকে নেমে আসে ক্ষুধার্ত বাঘ

এক-হাজার-এক রাত ভোর হলে, পরীর সাথে থেলা করবে আমাদের শিশু

মা আমার সন্তান যেন বাঁচে মদ মাংসে
 

সূর্যের বাজনা ২

আমার ছায়া গুটিয়ে নিলাম
দরাজ সূর্যের নিচে
যদি-বা জাদুকর তারা
হাসিতে আড়াল রাখে ছুরি
ফোঁটা ফোঁটা অনেক সূর্য
ছিটকে পড়ে জরিন ঘামে

সুমন্ত আলখাল্লায় কালোগন্ধ
বর্ণবিভায় শরীরে সমুদ্র ঝাপটায়
আন্দাজ হয় না একবিন্দু পশমও
তারা রাত বিছিয়ে দেয়
প্রবাল আকাশের নিচে

একজন একঝাঁক মাছ উড়িয়ে হাঁটে
সুতার বাঁধা
ঘেমে-যাওয়া আঁশ তাদের
তারার পিপাসাকাতর
আকাঙ্ক্ষায় জ্বলজ্বল
যদিও-বা খসে পড়ে

যদি তাদের চোখ এমন ছিল
পানোখের জিহ্বা
ফণাতোলা অন্ধকার ছিল
সেইসব

— তারা খোলস বদল করে পূর্ণিমায়

পাবো না? উজ্জ্বল দিন

মুঠি থেকে দূরে
রাত পিছলে সরে যায়
মোলায়েম চামড়ার তলে
বিষের নহর
তার ঝাঁজ আমাকে জ্বালবে
ধীরে

পোড়ার শব্দ গন্ধে
পূর্বপুরুষগণ
আর তাদের
না-দেখা আদলের মতো এ-গুঞ্জন
বলে আয়
এ নীলজলে ডুব দেই
আয়

ছিল তারা জাদুকর
প্রসঙ্গক্রমে শবনাম
সুঠাম সমুদ্রের জল
প্রস্তুত করো মদে
করেছিল প্রস্তাব
তবেই শূন্যে জাহাজ চলে

তার ছায়া লাফিয়ে নামে জলে

স্রোতপৃষ্ঠে সঙ্গিন নিঃসঙ্গ
ভেঙে যায় তোলপাড় মদে
ভাসিয়ে দেওয়া ফুল
বাসী হয়ে ফিরে আসে টুকরো ছায়া সহ
উপকূলে কুমারীরা ছায়াফুল
সে চেপে ধরে নিঃশ্বাসের নিচে
জোড়া ঘর্ষণে সৃষ্ট ঢেউ
চন্দ্রপৃষ্ঠ ধুয়ে দেয়

আমার শরীরে আর
ঢেউবিস্ফারে
পুরোনো চাবুকের দাগ ভিজে ওঠে
রক্তিম গন্ধ ছিল যদি
সেসব দাগ দগদগে
সব দাগ ধুয়ে
উঠে আসো সূর্যঅবতার

কোমল সূর্যের নকশায় আমার শরীর বিছিয়ে দিব
 

সূর্যের বাজনা ৩

ঘোড়ারং বিকেলে
বাহারি ময়ূরের শরীর ছেনে
বিচ্ছিরি পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি
আকাশে রাত খাড়ে রংবাজ
ঝরে পালক-পালক দিন
ঝাপটা ডাকে
তার উঁচুতে যাই
নিচে অনেক জ্বলে নিভে
চুড়ি শানানোর আওয়াজ
দেখি বাছুরের মায়াচোখ
দেখি খুর আর ঘুঙুরের ডেগা বাদ্যে
টগবগে তারা জ্বলে
তেড়ে আসে জোয়ালখোলা গলার কাটা ডাক
তারা তারা আকাশে দৌড়াতে থাকি
 

সূর্যের বাজনা ৪

চাকার ক্লান্তিতে ভাঙা ঘুম
নিয়েছে রোদের ঝরা ছায়ায়
খড়িমাটির বাজনায় মুছে-যাওয়া দৃশ্যেরা
আড়ালে ডেকে ওঠে ইষ্টিকুটুম
সহস্র সূর্য-ঝরানো সুরে

পিলসুজে পুড়ে যায় নাগরিক ঘ্রাণ

জোছনায় ভেসে গেছে যে পাখিদের ঘুম
ডানার বিষাদে বনভূমি জাগে কোথাও
এখানের প্রস্থানের দৃশ্য ঝুলে আছে
তলে ছড়ানো আধখাওয়া অন্ধকার
 

সূর্যের বাজনা ৫

তারায় বাঁধানো রাত
তারা চন্দ্র ঘিরে নাচে
যাদের শরীর ফুলের গন্ধে ভরা
তারা বাতাস বাজায় তারার হাড়ে
রূপের মাধুরী ডানাজোড়া
সমুদ্র গরাদ ভাঙে
সূর্য উঠে আসে
মানুষ মানুষ
রাত দিন রং করে
রাত দিন
সময় জমাট ধরে পাথর
এ পাথরও ঝরে
ঘুরে ঘুরে ও-পৃথিবী কোথায় উড়ে যাও
 

মৃত কবিদের প্রতি

খাঁজকাটা
ছায়া পার হই
শূন্যে জাল পাতা
তাদের গুঞ্জন গাঁথা জালে
এ চন্দ্রহাল
তারাখোর
আমার গলায় আলো বিঁধে আছে

ঐ তো দেখা যায় তোমাদের ডাক
চেহারা শুনতে পাই
কেন আমি সূর্যে বাঁধা?

বুঝি ঐখানে হুরনদী ফুল উছলায়?
বাতাস খুঁড়ে সে-গন্ধ তুলে আনি

কেন আমি সূর্য দিয়ে বাঁধা
 

গারদ থেকে ফিরে লেখা

(ঋত্বিক কুমার ঘটক-কে)

 
মদের পুকুর নিচে পড়ে থাক

আয় নীলকণ্ঠ
আমরা আকাশে উড়াল দিই
যাদের লাশ পড়ে আছে চন্দনের বনে
দেহ আরো সুবাসিত হোক
আয় কাঁটাতার ছিঁড়ি
আয় মেঘ পান করি
লাশ সুবাসিত হোক আরো

এখনো মদের পুকুরে ভাসে রাজহাঁস
পাতার গহনা পরা মেয়ে চন্দনের বনে
আয় তার দিকে চাঁদ ছুঁড়ে দিই

আয়
ডানায় তারাপথ বিলি কেটে
নতুন বাড়িতে ফিরি
আয় নীলকণ্ঠ
 

ভাঙা শঙ্খের দ্বীপ

কুরুপার বিষাদে ভরেছে আকাশ
তারা নয়
গণনারহিত লাশ ফুটে আছে

মৃত চোখ দেখে বিষাক্ত শরীর
বাতাসে ছোবল মেরে
হয়েছে নিথর

উঁচু মেঘের মিনার যদি তুমি
শূন্যে সমুদ্র বানাও
অনন্ত গর্জন ভুলে চুপ হয়ে যাব

রক্ত ছুঁয়ে ফিরে যায় বিষণ্ন জল
প্রবল সূর্যপ্রবাহে
গলে যায় বরফের ডানা

রেবতী রুবাই
ফিরব না ভাঙা শঙ্খের দ্বীপে
 

মায়ের মুখ

সুগভীর বক্রে পেঁচিয়ে নাও
খুব-একটা দুঃখের হলো না
এ গ্রহবদল

মায়ের মুখের মতন
পায়রা-সকল নামে না আর
কামারশালার লোহার গানে

ধারবাহী আগুন দেখে
ক্রোধে শুধু ঘুরছে চাকা
সহিস
এবার চাবুক থামাও
চোখ নামাও প্রশান্তির দিকে

দেখ
শরীরের রগে রগে এ ভূমির নকশা জাগে
 

বেশ্যালয়

পৌত্তলিকতা ভালোবেসে
কত দেবীর দেহে ফুল তুলেছি
ত্রিশূল
কত দূর বিঁধে অাছ
পুরুষেরই ক্ষুধা থেকে উৎসারিত পশুর পাল
খুরে ধাবমান মৃত্যু গেঁথেছ লালে
মাটির বাসনা খুঁড়ে দেখেছ কঙ্কাল

বাৎসল্য ভেঙে মাংস বুনেছি
খড়ের কাঠামো জুড়ে

অারো ধাবমান মৃত্যু ফুঁড়ে
কত দূর বিঁধেছ ত্রিশূল

লাল অারো সশব্দ হয়
এই তরঙ্গময় জবাফুলে
পবিত্র উপাসনালয়
দেয়ালে চিত্রিত শিৎকার
যেন পুরুষেরই ক্ষুধা থেকে উৎসারিত পশুর পাল ছুটছে অসীমে
 

পিপাসা

নিজের ভিতর গুমরে বিস্ফোরিত
ছিটিয়ে পড়েছ চূর্ণে চূর্ণে
গ্রহ-নক্ষত্রের চলাচল
ক্রমাগত চাবুক মেরে
বানায় এই ঢেউমালা
জাহাজ জাহাজ দৃশ্য বোঝাই করে
নোঙর করেছ
তার ক্ষত এ শরীরে
ঢেউয়ে ঢেউয়ে লেপে দেয়
এই নুনজল
যদি আমার চোখ সমুদ্রনির্ভর
তার আয়নায় মুখ দেখে
সূর্য কাঁপে পিপাসায়ীয়

দূরে দলপাহাড়ে

অমৃত সাগর লুকিয়ে

কুমারীর দল নেমে আসে ঝর্ণার মতো
 

টিনের জাহাজ

আর তত দূর দেখাবে না পাতার দূরবীন

সূর্য-চাঁদ-নক্ষত্র-মাছ-পাখি-শাদামেঘ-কালোমেঘ-দিনরাত মেখেছ চামড়ায়, বাতাস রেখেছ রোমকূপে, জল বিলি কেটে করেছ বাণিজ্যবিস্তার, সবুজ-সোনালি-রূপালি-লাল-নীল দ্বীপে দ্বীপে

সে-নকশা হারিয়েছো

জোয়ার থেমে আছে সাবানফেনায়
উত্তাল ধীরে ধীরে হয়েছে স্থির
বন্দর-রূপসীরা বিস্মৃতি খুলে রেখেছে ঘাটলায়
রূপ লুকিয়ে রেখেছে শ্যাওলায়
তাদের কচি দুধে বিঁধেছে হাঙরের দাঁত

আর তত দূর দেখাবে না পাতার দূরবীন

ভুলে যাও মৎস্যমেয়ের চোখ
ভুলে যাও কাঠের মাস্তুল

হে নাবিক, তোমার মরিচাপড়া টিনের জাহাজ তুলে রাখো
 

রূপকথা-প্রাচীন গান

তারা চন্দ্রকুমার
গায়ে বেশুমার
আলো টলমল করে
জোছনায় বাঘের দুধ খায়
তারা নৌকা ভাসায় চাঁদে

বাতাসের চোটে
চোখে তারা ফোটে
জলে জল গান গায়
গানে ঢেউ জেগে ওঠে
দূরে
তল্লাটে
রাত কাটে
বাঁশের জোয়ান পাতা

তার সবুজ ধার
অঙ্গে কাহার

শান দেয়
আহা শান দেয়

মোচড়ায় শ্বাসে শ্বাস
আয় ডাকে গোখরার ফণা
জাগে বিষের জোয়ার
জাগে
জোছনার শিসে
গাঙে আকাশ ঝাঁপ দেয়

নদী
ঝাপটায়
সাঁতরায়
আকাশের বুকে দোল খায়
নাচে আকাশের বুকে

নাচে চন্দ্রকুমার
চাঁদ জাপটে ধরে
গায়ে বেশুমার
আলো টলমল করে
চুর হয়ে পুর ভুলে যায়
বৈঠার সুরে নৌকা উছলায়
 

রূপকথা ২

তরঙ্গ তার ক্ষুধা বয়ে আনে

খণ্ড স্বর্ণের চাঁদ
মাংস ভেবে
রাতের নদীতে ডুবেছে যে বাঘ
তাকে পাড়ে ডেকে আনো
মধুমাখা ঘাস খেতে দাও
ও হরিণ
এসেছি লোকালয় থেকে
এ গল্প নিয়ে যাব
সবুজ ভূমি চিরে লাল নদী
যেখানে মাটি খুঁড়লেই হাড়
যদিও তাদের মাংসের পাহাড়
ঐ বরফের দেশে

এ বনে আসার পথে
ফুল
পায়ের তলায় গুড়িয়ে গেছে ঘ্রাণ
মচমচে বিষণ্ন সূরে
ও হরিণ
বনে বনে হাড় খুঁজে ফেরো

এ গল্প শোনাব যাদের
তারাও মাংসলোভী
দেখ, চোখ হিম
বরফদেশ থেকে আসা ও বাতাস
লেগে ঘাসে কাঁপছে অন্ধকার
ও রূপশালী চামড়ার পোশাক
চোখে করে নিয়ে যাব

কস্তুরী গন্ধে মাতোয়ারা
যে জনপদ জাগে ফসলের ঘ্রাণে
পাটায় শিং ঘষে তারা শিশুদের মুখে দুধ তুলে দেয়
নাচে-গানে তাদেরই নিয়ে যাব বসন্তের দিকে

ও হরিণ খণ্ড স্বর্ণের চাঁদ ডুবে যাক মাংসপাহাড়ে
 

কাঠে খোদাই-করা রূপকথা

কাঠের ঘরের পাশে
মাটির চুলায়
বোন আমার কাঠ পোড়ে
ভাত ফুটিয়ে খায়
তার মণিভরা আগুনের চাক
টুকরা কয়লায় পোড়ে গাছ
পাখির বাসা আর ভাইটির হাসি।
মাঠে
ঘাটে
ঘাসে
মুখর রোদে পোড়ে পায়ের ছাপ
তাপে ধান পাকে
ঝনঝনে বাতাস আর রিনরিনে রোদ নিয়ে
ভাই তার ঘুর ফিরে বনে-বাদাড়ে
পাতার গারদ থেকে ডিম তুলে রাখে পাখির বাসায়
তার গান মনে আসে
আসে লালচে পুরুষ
দেহভরা চকচকে ধানের মতো ঘাম
আগুনবলয় ঘিরে
ঘুরে ঘুরে হাতুড়ির সূরে গান গায়
আহ কণ্ঠ তার বাটালির ধার
ও বোনের শরীর খুঁড়ে সুর তুলে আনে
সুরে সরার তলে ফোটে সাদা ভাত
ফেন উছলায়

কাঠের রাত নামে টিনের চালায়
চাল পেরোলেই দেখা যায়
গণনারহিত সুখী পাখিদের চোখ ফুটে আছে আকাশের গায়
ডানা পেয়ে চাঁদ উড়ে আসে
উঠানের শাদা বুকে চুল সাজায়ে
বোন আমার গান গায় নিয়ে কোলভরা হাসি
 

রূপকথা কাবাঘর

ধীরে
রাগিনী রঙবাহারে
নরম পাখায় অনেক ফুল ছিঁড়েছ

ভোরের বেলায়
বাসমতি ধানের ক্ষেতে
আদরে সবুজ পেতে
আমি তোর লাল ছুঁয়েছি

সোনাইল ফুলের
হলুদ ছায়ায়
ধুলার সাথে
চুল ছড়ানো বালির বাসর
ভেঙে গেছে সাঁঝের বেলা

তুই যে ঘরে ফিরিয়া গেলি

আমি তখন একলা খেলি
গজাল গাঁথি
সোনাইল গাছে

তোর ঘুমে জ্বলছে জোনাক

বাসমতি ধানের ক্ষেতে
ফরফর করে আকাশ ছিঁড়িয়া যায়

আন্ধারে গুন্ধারে
ডানায় পালক গেঁথে
আশাবরী ফিরে আয়

ডাকছে তোমায় নরকের মিস্তিরি
 

রূপকথা  ৫

ঘননীল ময়ূরীর সাথে সন্ধ্যা হয়েছিলাম
পশ্চিমে তার হাসি নিভেছে পূর্বেকার
ধীরে ডানার ডাকে উজল হইছে চাঁদ
ঝলমল কইরছে সোনাইল ফুলের হার

গাঢ় অঙ্গে খেলছে আমার চোখ
আঙুল পেঁচিয়ে যাচ্ছে চুলে

আমাদের দেহ ডুবে যাচ্ছে ফুলে

ঘাটলায় তখন থেমেছে বাসন মাজার হাত
তারার সাথে খেলছে মাছের দল
জলের মতো ছিটিয়ে পড়ছে আলো —

ঐ যারা বকুলতলে বাজায় ঢোল
মন্দিরা
করতাল

তাগোরো কাজ ফুরায়া গ্যাছে বুঝি?

নেচে নেচে চাঁদের নিচে আমি আমার ময়ূর খুঁজি —
 

রূপকথার সিরিজ ৯

চোখ মুজলেই রঙের থৈ থৈ দেখি
দেখি তারাবোঝাই কালো সাম্পান
পিতামহীকে দেখি
সরিষার তৈলে জোয়ালের দাগ রং করে

কলাপাতায় মোড়ানো মাছ
থালা ভরা সাদা ভাতে
ঘ্রাণে সুভাসিত রাত

ঘুমিয়ে আছে মা
জোনাকির মালা গেঁথে

ডাকে ব্যথাতুর কাঁচা হাত

সোহেলী চোখ বুঁজে চোখ খোঁজে তার

মাতামহীকে দেখে
লাঙলের সিঁথিভরা দেহ
গোখরা ফণা-তোলা চুলে

তোড়া তোড়া শাদা তারার নোঙর
সবুজ উপকূলে
 

রূপকথা সিরিজের শেষ কবিতা

ঐ দূরের কালো চূড়ায়
তারকাঁটায় সূর্য বিঁধে আছে
তার
রক্ত আলো-টলটলে
এই সোমেশ্বরীর জলে
মানুষের হাড়ের বানানো নৌকা দোলে

পেট ভরে স্বর্ণগুড়া নিয়ে
ও নাও কোন দেশে যাও
কাদের মঙ্গলে?

এরা যে পাথর খেয়ে বাঁচে!

দালিমান্দা
আমায় আরো চুয়াং খেতে দাও
আমি ঐ সূর্য পাড়তে যাব

কালো চূড়ায় কাঁটাতারে সূর্য লটকে আছে
 

সমর্পণ

প্রলম্বিত আত্মা আমার
কোথায় ফিরিস বক্ররেখায়
আয় খুলব ছিপি রঙমহলে

কাঞ্চন নদীর তীরে
চন্দনকাঠের ঘর
সখি হইছে উজল
আর তুই পাথরের নৃত্য দেখিস

প্রলম্বিত আত্মা আমার

ঐ আকাশ জুড়ে
সোনারঙ পাখি ওড়ে
ঝাঁকে ঝাঁক পাখনা ঝনঝনায়
সোনালী স্বর বিঁধবে রে তোর গায়

আয় খুলব ছিপি রঙমহলে

সারারাত বনমোরগের ফর্ খুলেছি
তুই ছিলি পদ্মহেমধামে
পাথরের নৃত্য দেখি সারারাত
নীলের ক্ষেতে সূর্য জ্বেলে দিলো

সিদ্ধিঘরে আমায় ডাকিসনে রে আর
এখন আমি সূর্য বাজাই

প্রলম্বিত আত্মা আমার

দেখ সূর্য কেমন স্পর্শ পেয়ে বাঁচে
নত হও দেখ
ঝরা পাতায় গত বাতাসের নাচ
স্থির হয়ে আছে
 

শাদারাত হেমন্তের

শাদা অন্ধকারে ঝলসানো রাত
পোড়া পাতা, ঝরা সুতায় ছড়িয়ে আছে
ঘাসে যে শুয়ে ছিল
আকাশ উড়ছে তার রূপকথাদিন নিয়ে
বাসনাবন
হিম হয়ে আছো কেন হেমন্তে
এত আগুন উৎপাদন করে সেলাইমেশিন
কিছুই কি বুনেনি বসনে
মৃতের চোখের ইশারায়
প্রাণ বোনে মগ্ন আঙুল
কি যেন বলে সে কুয়াশাসংগীতে
ঘোরে মেশিন
চাকা
লাটিম
শাদারাত আকাশে ফোটে শাদা ভাত
 

নীল বিদ্রোহে নেশাপুর

‘পঞ্চতারার নকশা করা নায়ে
গো আমি যাইব সুরের দেশ
চোখে সুরমাপরা নুরানী মানুষ
নৃত্য করে ময়ূরবেশে’

ওহে চাঁদ, তোমারই নীলায়নে কত পুরুষ নুরানী হয়, খুঁজি তাদের মাঝে কোনো সুরমাটানা চোখ আছে কি না, খুঁজি কালা চানরে,

হায় রে অশ্রুর বাঁধ ভেঙেছে কার আঁখিপল্লবে?

কয়লার ফুলে বাঁধা রাঙা দুটি পায়

নিঠুরিয়া রে হাঁটিস নে শীরায়

এই সুসজ্জিত অস্ত্রশালার কারুকাজ ভেঙে পড়ে

যারা তূরপাহাড়ে প্রাথর্নারত, পাথর ঘিরে নত সেজদায়, শানঘরে কার রূপ ঝলকায় ওরে জুম্মন

প্রিয়ের মাংসের বাসনায় আপন মাংস কেটে থালা ভরেছ জুম্মন

আর তূরপাহাড়ে যত পাথরচাষী

কার মুখ খোদাই করে নিদারুণ পিপাসা জাগায় পাথরে

মরু-অবতার ক্ষুর নিয়ে ফেরে হাতে শূন্য থালা

জুম্মন আগুন জালা তূরপাহড়ে

সে প্রোজ্জ্বলে যত পার্থিবতার রক্তমিছিল

শেষে এই নীল যুবক তার স্বর্ণাভ ক্ষত নিয়ে নোঙর করে  যদি তোমার সুগভীর বন্দরে, চাঁদেরও সুদূরে আরো দূরের গ্রহ, তারও দূরের তোমার হৃদয়ে যদি প্রতিফলিত হয় তার কান্নার সুর! তুমি তারে দেহেরও অধিক প্রেম দিও কোহিনুর
 

ডাক

শৈবালে জনপদের নকশা ছাপা ছিল
যারা গ্রহে গ্রহে গচ্ছিত রাখে উৎসব
উত্তরপুরুষের
সূর্যের বাজনা পাণ্ডুলিপি থেকে

তোমাদের ঘুমন্ত দেহভঙ্গির মতো সূর্য অস্ত যায় বাংলাদেশের, ‘যারা স্বভাবে
আফ্রিকায় কাফ্রিকায়া আন্ধারে ঝুম, তামার প্রলেপ পিন্দা মাতায় বনেরে’, তাদের
স্বপ্নে সুঠাম মেঘের চলাচল, এই বর্ষান্বিত বনাঞ্চল ভুলে কাটা লাশ ভেসে
যায়, বিষবোঝাই জাহাজ কারা ডুবিয়ে দেয় আমাদের ফুসফুসে? যারা বখতিয়ারের
ঘোড়ায় চড়ে তরবারি উঁচিয়ে ফেরে দেখ তাদের মুখ কি চাকার মতো নয়? শোনো বলছি শাদা
তারার নোঙর ঠেকানোর কথা

শৃঙ্খলিত পালকে সাজানো, পাখনা-ছড়ানো ময়ূর দেখে, যারা ইস্পাতের জঙ্গলে
হারিয়েছ কণ্ঠস্বর, দেখোনি ডার্কডাস্টার মুছে দেয় সবুজ অক্ষর! দেখোনি উড়ন্ত
পাখির মতো এই মানচিত্রের ডানা কারা কেটে নিতে চায়? ‘ধাতব মিনারে তামায়
বান্ধিয়া সুর, তবে কি তোমাদের ফুসফুস ভিজিয়ে রাখবে কয়লা-মেশানো জলে?

তেল জল বায়ুর রূপকথা নিয়ে গভীর জলের মাছ লেজ নাড়ে দেখোনি, শান-দেওয়া আকবর
গানে ডাকে বুলবুল, ভুলেছ রূপশালি দোয়েলের দেশ! ঠোঁট তাক করে পালক ছুঁড়ছে
কাক, ধানের মতো ঝরছে মানুষের থোকা, দেখ এখানেও ঘুরছে সেই চাকা, শুরু হয়
মেশিনে নাচ, থেঁতলে যায় ক্রমবর্ধমান ভূমির শ্বাসমূল!

আয় অগণিত মাতালের দেহ দিয়ে বেঁধে দেই এই উপকূল

hand-painted-oil-wall-art-Elegant-warm-color-sun-decoration-Abstract-Landscape-oil-painting-on-canvas

হরিণাস্ত বেলায় সুন্দরী মা

[কস্তুরীর গন্ধে মাতোয়ারা যে জনপদ জাগে ফসলের গানে
পাটায় শিং ঘষে তারা শিশুদের মুখে দুধ তুলে দেয়
— রূপকথা সিরিজ থেকে]

 
শ্যামলা জলে হরিণের লুটোপুটির মতো হাসে দুধের শিশু, তুমি তাকে কোলে নাও, বুকে তোলো, নাভীতে নামাও, ফিরিয়ে নাও যোনিপথ ধরে। বনের গভীরে যারা বসাবে আলোর মেশিন, বনময় ফিরছে তাদের চাকা

আবার যখন হরিণোদয়ের বেলা, কাঁচা পায়ের চুমায় আদর জাগবে বনে, দুধের শিশু ফুলের বেশে বাতাসে দোল খাবে, তাদের সুবাস জমাট হবে হরিণের নাভীমূলে

এখন প্রবল বিদ্যুতায়িত খুরে খুন হইছে সুন্দরী মা-র ছেলে, সোনার জলে হরিণ অস্ত যায়

কয়লা আকাশের তলে
কয়লার ফুল
কয়লার ফল
কয়লার পাখি
কয়লার মতো শব্দ শোনা যায়!

সুন্দরী মা-র কান্না শুনে ভাঙছে বাঘের ঘুম
সমুদ্র তারে পাঠাইছে এবার তরঙ্গে শানানো দাঁত
মা তোমার দুধের শিশু বুক পেতে ধরছে বজ্রপাত!
 

বসন্ত ফিরিয়ে আনে অস্ত্র মাজার দিন

পুরুষের বিষণ্নতায় প্রস্ফুটিত আকাশ, তোমার পথ ধরে যারা অস্ত্র নামায়, তাদের তৈলাক্ত ইশারায় মরুবসন্ত করুণ হয়েছে। নিহত বন্ধুর পাশে পুরুষের অশ্রুপাত, আর তুমি তারপিন-দাহ্যতায় কামনা করো ঝুলে-পড়া নারীত্ব নিয়ে কেউ খেলা করুক। আমার কেবলই মনে পড়ে কৃষকদের কথা তাদের ভাঙাচোরা কৃষিযন্ত্রের কথা, মনে পড়ে নর্দমায় সাঁতরানো ভ্রুণ, আজ কোন মাঠে রোপন করো রক্তবীজ?

পরিণতিহীন লক্ষ্যে দেহতে বন্দি দেহ তোমাদের, পণ্যায়নের হ্রদে ডুবেছে সজ্জিত মুখ, তারপিন-দাহ্যতায় আদরের মাংস খসে পড়ে। খুলে লজ্জাকরুণ ঘের বসন্ত ফিরিয়ে আনে অস্ত্র মাজার দিন, মাংসল ফুলে ফোটে প্রিয়তম বেশ্যার মুখ, মুঠিতে চেপে-ধরা পিস্তল থেকে ছিটকে যায় কত রেশমি ঘোড়া

তারা কি ভুলেছে, লোহাবোঝাই কত অরণি কাঠের ক্যারাভ্যান ক্রমাগত সূর্য ভেঙে গেছে সময়হীনতার দিকে

বসন্ত ফিরিয়ে আনে পিস্তল মাজার দিন
 

কালো জাহাজের উপকথা : পর্ব এক

(বন্ধু শাফিনূর শাফিনকে)

 
বসন্তে মুখরিত প্রাচীন জনপদ তার মুখশ্রী-ছিঁড়ে-আসা ক্রন্দন নিয়ে ঘুমিয়েছো, ঘুমে শুশ্রূষা নিয়ে জাগছে যার বাতাসে-বোনা মুখ, তুমি কি তাকে অস্বীকার করো?

অস্বীকার করো তোমার দু-হাত ভরেছে তারাবাইন মাছে? পুরুষ-লাঞ্ছন তোমারই আত্মা চিরে আসা রিরংসা, সকল প্রেম ছিল হারানো জাহাজের

নক্ষত্র ফোটার আগে — খুলে তরঙ্গশিকল, সুমহান মাতালের মতো আপন মুখশ্রী আমিও করেছি পান। কালো কালো নাচে জেগেছে কাঠের পাটাতন, জং-ধরা সে স্বর যারা ফিরিয়ে আনো এই শস্যতীরে

ফিরিয়ে আনো শ্যাওলায়-ঢাকা ক্ষতচিহ্ন সব — ক্ষুধায় উৎপাদিত আরো অধিক মুনাফা আকাশে — শোনো, উল্লাস ছিল কালো জাহাজের, ক্ষুধা ছিল না, ক্ষুধার স্বপ্ন ছিল মনে

তবু আজও তোমার দেহের মতো অবিকল জাহাজেরা নোনা বন্দর ছেড়ে যায়
 

কালো জাহাজের উপকথা : পর্ব দুই

দেবায়ন ঘিরে যার নয়নের নকশা-করা অন্ধকার, তার আত্মা খুঁড়ে যত কঙ্কাল ভেঙেছি, তাদের কোটরে ছিল শাদা বন্দর, বিউগল থেকে দূরে তোমার অন্দরে নোঙর করে যার বিস্মৃত হাসি, তার মুখের মতো নির্জন এই বনেদি কুটিরে যে লাফাঙ্গা আজও শিস ছুঁড়ে দেয়, তার আত্মার মতো বিষাক্ত হয়েছি তোমার ঘোলা চোখ দেখে

মেঘ মেঘলায় নিমজ্জিত কুটির, নেশায় চুর হয়ে কক্ষ-কক্ষান্তরে খোদাই করেছি বেণীবাঁধা তা তা থৈ থৈ দিন, ব্যালকনিতে কুসুমিত জল, জলে ভাসমান বিউগল, আধডোবা দূর্বায় পিঁপড়ের চলাচল, তারও বেশি নৈঃশব্দ্যে-শোধিত কাঞ্চা তনে হলদে শিহরণ ছিল

কত তর্জনী উপেক্ষা করে ফুটেছে রক্তফুল, সুরভিত উরুর হিল্লোলে তুলকালাম জলাধার, তার বাষ্পায়িত বাসনায় মেঘ আরো সজল হয়েছে

ছড়ানো শঙ্খের দ্বীপে ভুলে শিস হারানোর ব্যথা, তুমুল পদধ্বনির মতো বিষ্টিতে ভিজে আরো কত রূপকথা কল্পনা করা যায়, সেসব কথার মতো সজ্জিত বনেদি কুটির যার নয়নের নকশা-করা অন্ধকারে নিমজ্জিত, আমি তারই অতলে তলাই

আজ কোথায় রে লাফাঙ্গা তুই, হারানো জাহাজে ভেঙে আলোর কঙ্কাল, কার শয়নভঙ্গির মতো শাদা বন্দর, তোকে ফিরিয়ে দেয় করুণ সাগরে, আয় শিস দে
 

জন্মরজনীতে লেখা কবিতা : শিঙ্গা

(মহান বন্ধুদের প্রতি)

 
ছিলে শূন্যে ভাসমান
আলো জল কুণ্ডয়নে
লম্বমান বৃক্ষ তুমি
শিকড়ে সমুদ্র ডাকো

স্মরণ করো
সে-সঞ্চরণশীল ভঙ্গিমা
তার কারুকাজময় ধ্বনি
বিঁধেছে যাদের
লবণ-মাখানো গায়
লক্ষ যোনিভ্রমণে গ্রহপুঞ্জ ভাসিয়া যায়

কণ্ঠে পানোখ-প্যাঁচিয়ে-রাখা অনন্তকাল
আয়না-সাজানো এ ব্রহ্মাণ্ডে
যেদিকেই হেরি
আমারি রূপ দেখে
এই বিষ পান করে যাওয়া
পুনঃপুনঃ জন্ম মেনেছি

চুম্বন করেছি অগ্নিকুণ্ডে

শীতল করো
হে হিমালয়-পেরোনো হাওয়া
সুর্যশিঙ্গা বাজাও তুমি
ফেনায় ফেনায় জাগছে ভূমি
পদচিহ্নে লেখা এই বিচরণ
মনে রেখো
ছিলে শূন্যে ভাসমান

...

কিশোর মাহমুদকিশোর মাহমুদ
কবি

Leave a comment

Filed under সারথি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s