কোহেন এবং তার নীল বর্ষাতি / আজমাঈন তূর হক

c2

[অগ্রজ তাহমিন সিতাব, কোহেনগুরু কে]

সেই গানওয়ালাকে ভাবা যাক, যে ঘামগন্ধ-রোদ ভিড়ের মধ্যে গান গায় নিজের মতো করে, নিজের মনে মনে, ল্যাম্পপোস্টের একটা অংশ হয়ে তার সাথে ঝুঁকে যে গান গায় নিজের কথায়, স্নোফল মাথায় পরিয়ে দিতে পারে শাদা কোনো একাকিত্বের হ্যাট; এক কবিকে ভাবা যাক— হিটলারের জন্য ফুল পাঠানোর কবি, লেওনারড কোহেন ও তার আপাতস্থির ঘোরলাগানো গিটার-প্লে ভাবা যাক!

c1 লেওনারড কোহেন, ষাটের দশকের সুবর্ণ সন্ত্রাসী সময়ে, কানাডিয়ান এক সদ্য যুবক, আশৈশব যার প্রেম ছিল লোরকার কবিতার প্রতি। কবিতা লিখছিলেন সেসময়, আনকোরা জীবনবোধে ও কখনো বিদ্রোহে উচ্চকিত সব কবিতা, তার শুরু ওই কবি হিশেবেই, প্রথম বই যদিও উপন্যাসের। স্মোকবার্নিশড কণ্ঠে, অতিনির্লিপ্ত তিনি যখন গানের লাইনে প্রবেশ করেন, তখন থেকেই ক্রমশ তিনি হতেছেন আলাদা। ষাটের সেই ঝড়ো সময়ে, যখন চলছে তরুণ শিল্পীদের ফোক আন্দোলন, অতিসক্রিয়তায় আক্রান্ত যার লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার, তখন যুক্তরাষ্ট্রে এসে কোহেন নতুন সময়ের গানকে বুঝতে চাইছেন, অনুভব করতে চাইছেন সেই গান যা ফোকের আদলে হয়ে উঠতে চায় সময়ের ভাষা। সেসময় হাওয়া যখন নতুন ভাষাপ্রাপ্ত গীতিকার আর গায়কদের, তখন কোহেন সব বুঝেও কেমন যেন অতিব্যক্তিগত, অনেকটা নিচু স্বরে নিজের মতো করে কথা বলে যাওয়া, কখনো মনোলগের মতো, বাক্যের পর বাক্য, মধ্যবর্তী কিছু পজ্ দিয়ে বলে যাচ্ছেন। ষাটের ত্রুবাদুর— বব ডিলান, চারপাশে তখন একের পর ক্ষুদে ডিলান তৈরি করছেন, গানে তার দীর্ঘভারী বৃষ্টিপাতের সুর, সবার জানা জবাব নতুন করে জানিয়ে দেয়া; এর মধ্যে মুক্তবাজার নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে ঠিকঠাক। সিস্টেমের বিরুদ্ধতার জায়গা থেকে কথা বলত যে ফোক, মৃদু অ্যাক্যুস্টিক আর ভোকালে ভোকালে, তাও বড় বড় লেবেলের নাম থেকে বাজারে আসতে শুরু করেছে। ৬৭-তে কোহেন অংশ নিয়েছিলেন নিউপোর্ট ফোকফেস্টিভালে, ওই-বছরই প্রথম অ্যালবাম রেকর্ডের কাজও শেষ হয়, কোহেনীয় কারবার তার প্রথমদিকের ‘স্যুজান’ থেকেই জারি হয়ে গেল।

কোহেনের গান নিচু সুরের, গানের মধ্যে বিরতি প্রচুর, কোনো কোনো গান আবার একেবারে গদ্যের ভঙ্গিতে লেখা ও বলে-যাওয়া। ডিলান যখন একটা স্থানে দাঁড়ানো ভিড়ের সকল মানুষের জন্য গান লিখছেন, কোহেন তখন লিখছেন নিজের জন্য এবং ওই ভিড়ের প্রত্যেকটি আলাদা ও ভিন্ন মানুষের জন্য, তাই তার গান কখনো কখনো এত নিজস্ব এবং আলাদা। কোহেনের গান বেশ প্রতিসরণক্ষম, প্রত্যেক স্রোতে, প্রত্যেক শ্রবণে ভিন্ন একটি মাত্রা প্রদানের সক্ষমতা ধারণ করে এসব গান। কখনো ডায়েরির ভঙ্গিতে লেখা লিরিক, তদুপরি আছে বিশেষ শব্দ, স্বরভঙ্গি কিংবা লাইনের পরে বিরতি, যা শ্রোতাকে ব্রিদিং স্পেস প্রদান করে কিছুটা, নিজের সাথে কিছুটা মিলিয়ে নেয়ার অবকাশও হয়তো-বা পাওয়া যায়, এই স্থানে …

১৯৭১ সালে কোহেনের তৃতীয় স্টুডিও-অ্যালবাম বেরোয়, সংস্ অফ ল্যভ অ্যান্ড হেইট, যার ট্র্যাকলিস্টের দ্বিতীয় অংশের প্রথম গানটি ছিল— ফেমাস ব্লু রেইনকোট। কেমন গান এই বিখ্যাত নীল বর্ষাতি নিয়া? তাহা, বলা বাহুল্য, কোহেনীয়; এবং একটা চিঠির ভঙ্গিতে লেখা, যার নিচে L. Cohen-এর স্বাক্ষরও পাওয়া যায়। ফেমাস ব্লু রেইনকোট একটা প্রেমের গান, একখানা বন্ধুত্বের এবং বিশ্বাসঘাতকতার জমাটি নাটক বলেও তাকে শনাক্ত করা সম্ভব বটে…

c4গানের সূচনা নিচুলয়ের প্লাকিং দিয়ে, পুরোটা সময় জুড়ে ভোকালের পিছনে এই প্লাকিং চলতে থাকে। কিছুক্ষণ বাদে প্রবেশ করে দলবদ্ধ নারীকণ্ঠ, মিউজগণের ভেজা ভেজা কণ্ঠের আলাপসদৃশ, কানের জন্য আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতার ভিতরেই দুম করে প্রবেশ করবে লিরিকের গল্প, আর শ্রোতার মুখ ট্র্যাজিডিতে তিতকুটে ধরা শুরু হয়ে গেছে। প্রথম প্রবাহে ব্যাপারটা বেশ সহজ, লাভ-ট্রায়াঙ্গেল, কোহেন, তার প্রেমিকা জেইন এবং কোহেনের এক বন্ধু এর তিন কৌণিক বিন্দু। বিখ্যাত নীল বর্ষাতির মালিক সেই বন্ধুটি, যে কোহেনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তার বান্ধবীর সাথে প্রেম করেছিল কোনো এক সময়ে, এখন এই অকৃতজ্ঞ বন্ধুটি মরুভূমিতে থাকে, তার নীল বর্ষাতিটি ছিঁড়ে গেছে কাঁধ থেকে। শীতের ভোরে, ৪টায় জানালার ধারে বসে কোহেন তার বন্ধুটিকে লিখছেন। এইখানে শ্রোতার প্রথম খটকা। চিঠির প্রেরক এত নির্লিপ্ত কী করে, তার প্রতি, যে কিনা তার বন্ধুত্বের অমর্যাদা করেছিল তার সাথে? বারবার একটা প্রশ্ন— Did you ever go clear? যেন উত্তরটি ঠিকঠাক হয়ে গেলেই পত্রলেখক তার বন্ধুটিকে একদম ভুলে যেতে প্রস্তুত, যেন পত্রলেখকই তার পূর্বজীবন ভুলে যেতে অধিক রাজি। রেইনকোট ছিঁড়ে যাওয়া ব্যাপারটা— পুরনো বন্ধুটির ক্রমে ক্রমে অসহায় হয়ে পড়া, যা পত্ররচয়িতার জন্যও নিয়ে আসে একটা মনোটনি; তারপর আবার— You’re living for nothing now… এতে তো উৎফুল্ল হয়ে উঠতে পারেন পত্ররচয়িতা, তার শত্রু আক্রান্ত, জীবনের অর্থরহিত হয়ে, কিন্তু তার কণ্ঠ কেন বিষণ্ণ? কেন দ্বিতীয় লাইনেই— I’m writing you now just to see if you’re better— এ-রকম ভাবনা, এ-রকম খোঁজখবর নেয়া সেই বন্ধুর যে কিনা চলে গেছে তার প্রেমিকা জেইনের মন নিয়ে, লেখকের থেকে অনেক দূরে? আমরা ভিতরে প্রবেশ করি আরো, আরো কয়েক লেয়ার ছাড়ানো যাক—

And what can I tell you my brother, my killer
What can I possibly say?
I guess that I miss you, I guess I forgive you
I’m glad you stood in my way.

— এখানে এসে চিঠির অনেক ব্যাপার কিছুটা বোধগম্য (?), আরো প্রকাশিত, তবে পত্রলেখক মিস্ করেন তাকে, তার বন্ধুতা, তাকে তিনি ক্ষমাও করে দিয়েছেন; জেইন দু-জনারই ভালোবাসার মানুষ সন্দেহ নেই, কিন্তু জেইন সুখী ছিল সেই বন্ধুটির পাশে থেকেই, পত্ররচয়িতা এল্ কোহেনের পাশে থেকে নয়। কিন্তু এটা তাকে ঠিক ততটা বিষণ্ণ করেনি, দুঃখী করেনি, বরং তিনি আনন্দিত, জেইনকে খুশী দেখতে পেয়ে; Yes, and thanks, for the trouble you took from her eyes / I thought it was there for good …; অতএব, খুনী বন্ধু আমার, ধন্যবাদ! তারপর সেই দৃশ্যবর্ণনা, তিনি যেখানে তাকে দেখেছেন ঠোঁটে গোলাপ নিয়ে, জেইনের সামনে, প্রতিদিন স্টেশন থেকে ফিরে এসে, জেইনের কাছে বারেবারে ফিরে এসে। এখানে রহস্য আরো ঘনীভূত হয়, এই দৃশ্য এল্ কোহেনের জানার কথা নয়, আবার তার বন্ধুর প্রতি সমগ্র গানের মধ্যে প্রবাহিত সমবেদনার কথামালাও থাকার কথা নয়, ব্যাপারটা এমন যে পত্ররচয়িতার কাম্য ওই স্থানটিই, জেইনের সামনে, ঠোঁটে গোলাপ নিয়ে, ওই স্থানটি নিতে পারলে খুশি হতেন সবচে বেশি, এবং এখানে এসে আসল প্রশ্নটি চলে আসে, এবং শ্রোতা আরো একবার মিস্ট্রি স্রোতে— আসলেই তৃতীয় কেউ আছে কি? নাকি লেওনারড কোহেন ইজ রাইটিং টু লেওনারড কোহেন হিমসেলফ? ব্যাপারটি এভাবে মাথায় ঢুকে যাওয়ার সাথে সাথে অনেককিছু ক্লিয়ার হতে চায়, কেন এই চিঠিটির ভঙ্গি জার্নালের মতন, কেন পত্ররচয়িতা তার বন্ধুর অভিনীত দৃশ্যসকল বলে যেতে পারেন নির্ভুলভাবে, কেনই-বা নিউ ইয়র্কে জানালার ধারে এল্ কোহেন সেই তরুণকে ক্ষমা করে দিতে পেরেছেন সহজে, মরুভূমির ভেতর ঘর-তৈরি-করা যে এখন এক একাকী মানুষ, যার উদ্দেশ্যে লেখা এই ডায়েরিগন্ধী পত্র, সেই একই মানুষ কি বসে আছে জানালার ধারে, ডিসেম্বর-ভোরে? আবার এই সম্ভাবনাটিও শ্রোতাপাঠককে একেবারে নিশ্চিন্ত হতে দেয় না, ধোঁয়া পুরোপুরি পরিস্কার হয় না সেই ডিসেম্বরের ভোর ৪টায়, কিছু কুয়াশা ও তৎসংশ্লিষ্ট জটিলতা লেগেই থাকে। প্রত্যেকের নিজস্ব আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে-থাকা আধুনিক মানুষই হয়তো তা-ই, এই গানের পত্ররচয়িতার ধরনেই আইসোলেটেড এবং অনিশ্চয়তাআক্রান্ত। এই-যে শ্রোতাকে একবার আলোতে নিয়ে গিয়ে সাথে সাথে আবার অনিশ্চয়তায় শিফট করা, এতে করে হয়তো কোহেনের কোনো স্পষ্ট কাহিনি কিংবা বাস্তবতা দাঁড়ায় না, নাম্ব একটা বোধ তৈরি হওয়া ছাড়া। এই গানটাও কি তবে কোহেনের অনেক গানের মতো নিজের অস্তিত্বের মধ্যকার প্রতিধ্বনি হিশেবেই দাঁড়ায়া গেল! কূলকিনারা করা বেশ কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো অদরকারীও; Jane came by with a lock of your hair— জেইনের এই উপহারপ্রাপ্তি, প্রেমযুক্ততা; এই কেশঅলঙ্কারই সঠিক, আর সঠিক সেই রসায়ন, কোহেনীয়, অনেক সময় রহস্যময় এবং কূলকিনারাবিহীন, যেটা আজ অবধি কোহেনে দৃঢ়প্রকাশিত, প্রেমের শেষ কিনারা অবধি যার নাচ!

ফ্রেটে অলস আঙুলবাদ্য নিয়ে এই গান তাই সেই ত্রিভূজের গল্প, যেখানে প্রেমিকা জেইনের দুইপাশের দুই বিন্দু প্রায়ই একসাথে মিলেমিশে যেতে থাকে, তখন বিশ্বাসঘাতক আর আক্রান্ত মানুষটার মধ্যে শনাক্তযোগ্য কোনো দূরত্ব চোখে পড়ে না, লেওনারড কোহেনের ভারী ও নৈর্ব্যক্তিক কণ্ঠে এটাকে একাকী অস্তিত্বের জার্নাল হিশেবেই শুনতে হয়, আর করোটিকে অ্যাক্যুরিয়াম জেনে মিস্টিক মাছের প্যাঁচ-খাওয়া প্র্যাক্টিস্ করে…

...

c6আজমাঈন তূর হক  কবি ও গদ্যকার


 
লেওনারড কোহেন, ষাটের দশকের সুবর্ণ সন্ত্রাসী সময়ে, কানাডিয়ান এক সদ্য যুবক, আশৈশব যার প্রেম ছিল লোরকার কবিতার প্রতি। কবিতা লিখছিলেন সেসময়, আনকোরা জীবনবোধে ও কখনো বিদ্রোহে উচ্চকিত সব কবিতা, তার শুরু ওই কবি হিশেবেই, প্রথম বই যদিও উপন্যাসের। স্মোকবার্নিশড কণ্ঠে, অতিনির্লিপ্ত তিনি যখন গানের লাইনে প্রবেশ করেন, তখন থেকেই ক্রমশ তিনি হতেছেন আলাদা। ষাটের সেই ঝড়ো সময়ে, যখন চলছে তরুণ শিল্পীদের ফোক আন্দোলন, অতিসক্রিয়তায় আক্রান্ত যার লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার, তখন যুক্তরাষ্ট্রে এসে কোহেন নতুন সময়ের গানকে বুঝতে চাইছেন, অনুভব করতে চাইছেন সেই গান যা ফোকের আদলে হয়ে উঠতে চায় সময়ের ভাষা

 

এইভাবে লাল জীপের সঙ্গে থাকুন… হে প্রিয়। হে প্রেম। সময়ের ডানা আপনাকে কাঁপাবে।

1 Comment

Filed under সারথি

One response to “কোহেন এবং তার নীল বর্ষাতি / আজমাঈন তূর হক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s