আনন্দ শংকর / আরফান আহমেদ

TANUSREE-AND-ANANDA

TANUSREE AND ANANDA IN THE WINTER OF 1976 AT TOLLYGUNGE CLUB

সাতটায় একটা ‘টক’ আছে, কিন্তু তারো আগে কিছু কাজ গুছানোরও বাকি আছে, তাই বেরুই একটু আগেই। আবার পথের আগা-মাথা জ্যামও আছে। দেড়টায় বেরিয়ে পড়ি ঠিক সময় মতন শাহবাগ, ধরা যাক দু’একটা বাস এবার। বৃষ্টির ছাট বাড়াতে, পিজির ওষুধের দোকানগুলার সামনের পথে আশ্রয় নিলাম, বৃষ্টি খানিক খানিক বাড়ে। দুইটা প্যারাসিটামল কিনে মনে হয় যাই আজিজে, অন্তুত দুই একটা বই দেখতে দেখতে বৃষ্টি চলে যাবে। আজিজে গিয়ে এক দোকানে পানি চাইলাম, কয় পানি নাই। আরেক দোকানে পানি দিয়ে ২টা ট্যাবলেট কোৎ করে গিলার আগেই একটা চায়ের কথা বলে রাখলাম। চা খাওয়ার পরেও দেখি বৃষ্টি কমে না। ইতিউতি ঘুরাফেরা করার চেষ্টা করি, কিন্তু কাপড়ের বাজারে আমার কোনদিন ভাল লাগে নাই। আমি অই আজিজের নীচতলায় প্রথম লেনে যে সিডির দোকানটা আছে অইটার দিকে যাই, দেখি নতুন কি ওরা পাইরেট করল। কি জানি দোকানটার নাম! আমার মনে নাই। অনেক কিছুই মনে থাকে না কোন কারণ ছাড়াই।

দোকানী হাসি দিয়ে বল্ল, ভিতরে চলে আসেন, আমি অই কাউন্টার অতিক্রম করে ভিতরে চলে যাই ব্যাগটা রেখে, পাইরেটেড সিডি গুলি দেখি। উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদের কালেকশনটা তাদের ভালই। একসময় তাদের কাছে নিয়মিতই যাইতে হইত। তখন আমার ইন্টারনেটের গতির অবস্থা ছিল বেহাল, আর আমার আশে-পাশের মানুষ জন তখন এই সব শুনত না, এখনো যে তারা শুনে তাও ঠিক নয় , কিন্তু এখন দেখি আমার আশে-পাশের লোকজন এইসব শুনে তার মানে আমি আমার, আশ-পাশ পাল্টাইসি মনে হয়। যাই হোক খুঁজতে খুঁজতে দেখি আনন্দ শঙ্করের একটা ৪ সিডির কম্পাইলেশন। অনেক আগে, লাইট মাই ফায়ার এর কাভার শুনসিলাম। তখন কেন জানি মনে হইত, ডোরস্এর চাইতেও আনন্দ শঙ্করের কাভারটা আরো ভয়ংকর। মনে হইল, পকেটের টাকায় একটা সিডিতো কুলাবেই। ঝটফট কিনি, বৃষ্টি তখনো ধরে আসে না। কেনা সিডিটাই বাজাতে বলি। প্রথমটার নাম ‘কলিকাতার পথে প্রান্তরে’!

বাজানোর সাথে সাথেই সত্তুরের ইলেক্টিক আওয়াজ মগজের তার গুলোতে বেইজ হয়ে বাজতে থাকে। ছবি খুঁজতে থাকে, মাথাটা যেন তখন গুগুল, সত্তুরের কলকাতা সত্তুরের রঘু রাই! নাহ মেলে না, আনন্দ শঙ্কর অনেক রঙীন, কিন্তু রঘুর মতনই ‘নির্ধারনী মুহূর্তের’ খেলা। অথবা রঘুবীর সিং। কি জানি কিন্তু অই সকল পথের উৎকন্ঠা, উত্তেজনা অই সকল রগরগে কারবার শরীরের পেশিগুলোকে উন্মাদের মতন নাচিয়ে দেয়। অইযে হিপিরা আসছে। অইযে সত্তুরের দশক মুক্তির দশক, অইযে রেড লাইটের লকলকে জিব্বা , অইযে এম্বাসেডরে মুখ ঢেকে চলে যায় খুনিদের বাবা মা। বৃষ্টি আরো বাড়তে থাকে। আমি মিশে যাই আনন্দে।

পশ্চিমের সঙ্গীত বর্ণনা করে। কিন্তু অই রক এন্ড রোলের পরের যামানা আর তা করে না। কেমন যেন একটা ভাব অথবা আরো অনেক মানসিক অথবা বিমূর্তি নিয়ে তার আড্ডাখানা, আর চরম এনার্কিস্ট। আনন্দ বুঝে যান সব। অই অনুভূতি অথবা এক্সপ্রেশন আর তার নিজের মুন্সিয়ানা, উত্তর ভারতীয় সেতারে। কি অদ্ভুত মিশে যায়। একে অপরে ফানা ফিল্লা।

আমার যাত্রা শুরু হয়, পেছনে। যে যুগ আমি দেখি নাই। আমার চোখের সামনে বাইস্কোপ। পার্কারশন আর সেতার আর নানা নাম জানা না জানা কি কি জানি বাজে। ডিস্কো আসে আসে গ্রুভ। চোখ জ্বলে ওঠে। আর খুব মনে হয় বড় পাপ হে। এ পাপের সঙ্গীত পপেরও! এর মাঝে বাজে কঙ্গো, অশান্ত কঙ্গো কিংবা পাখোয়াজ, বেইযের সাথে সেতার। মাঝে মনে হয় পূর্ব আর পশ্চিম মিলে এখন শিল্পীরা, সঙ্গীত করেরা যা করছে, তার পূর্বপুরুষ আনন্দ। মিসিং লিঙ্ক।

বাজারে আনন্দ নিয়ে তেমন কথা হতে শুনি নি, অথবা অন্য কোন আড্ডায়। কিন্তু একটা লোক বিপরীত ভাঙা দরজা আর শার্শীটা ঠিকি মিলিয়ে দিলেন। বিটিভিতে নাটকের জন্য এমনি মিউজিক হত মাঝে মাঝে। এখন আর হয় না। তখন হয়তো কেউ আনন্দ মেরেছে অথবা ঠিকি নিজের মতন খুজে পেয়েছিল রতন। সিডি আগাতে থাকে। সূত্রগুলো এলোমেলো ঝড়ের মতন। এখানে ওখানে বৃষ্টি বাড়তে থাকে। এক সিডির পরে আরেকটা কিনে ফেলি, ভাবি এইমাসে তাহলে এক’শ টাকা শট।

সঙ্গীতের নাম ‘বিপ্লব’। বিপ্লব কেমন! বল প্রয়োগের খেলা, শত্রু শত্রু খেলা। মাথার ওপারে শকুনের নিঃশ্বাস। আর সময় চলেতো একটা উল্কার সাথে। প্রতিরোধের প্রতীজ্ঞা আছে। আছে অদম্য সাহস। আছে শোক, মৃত্যু এবং ধর্ষন। জল্লাদের উল্লম্ফন। আর চরম প্রতিশোধ। আর অইযে অবসরে স্মৃতির কোনে সেই গুমড়ে মরার ভয়। চরম চলে তবলা। অইযে কুচ কাওয়াজে আসে রোমের সেনা। সশস্ত্র, তীরের ফলায়, তলোয়ারে বিষ। দেবী আসেন। মা দূর্গা? ত্রাতা? নাকি সত্তুরের দশক সর্বহারার? প্রতিরোধ আসে, প্রবল প্রতিরোধ। সম্পূর্ণ বিপ্লব! মর্ডানিস্ট!

এর মাঝে সত্যসাঁঈ বাবা আসেন। থাকেন হিপি, থাকেন হেনরিক্স, ডোরস, ডিস্কো, জ্যাজ, মাঝে শোঁ শোঁ করে ঢুকে পরে দক্ষীণ ভারত। রঙটাই কেমন যেন! মরা, গভীর, কালো, খয়েরী। কিন্তু মখমলের ঝিলিক। কোথায় যেন একটা অপরাধের শুড়। অপরাধ নাকি পাপ! আমিইবা সঙ্গীতের কি বুঝি! মাতালের লুসিড স্বপ্ন! পৃথিবীটা অতিপরাবাস্তবের খোলস। চ্যাপ্টারের পরে চ্যাপটার। মহাকাব্যের মতন ব্যাপ্তিও থাকে। দৃশ্যের অনুভূতি ভূট্টারই খৈ! বৃষ্টি ধরে আসে। আমার তাড়া থাকে। আধ ভেজা শরীর নিয়ে কোন এক রিক্সাওয়ালার সাথে বাজে দরদাম করে ধীরে ধীরে চলে যাই।

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
ছবিসূত্রঃ telegraph india

...

arfun। আরফান আহমেদ ।

ফটোগ্রাফার

Leave a comment

Filed under সারথি

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s