নোয়া নোয়া / মেসবা আলম অর্ঘ্য

নিস্তব্ধতা! রাত্রিকালীন তাহিতীয় নিস্তব্ধতাকে আমি চিনতে শিখছি ক্রমে।
এই অসীম নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধুমাত্র নিজের হৃদ্‌স্পন্দন ছাড়া আর কিছুই আমি শুনতে পাচ্ছি না।
       বাঁশঝাড়ের মধ্যে চাঁদের আলো খেলা করছে। আমার কুটিরের সামনেই বাঁশঝাড়গুলি নিজেদের মধ্যে সমদূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরই মধ্য দিয়ে এসে চাঁদের আলো আমার এই কুটিরেও পৌছে যাচ্ছে। আর মধ্যে মধ্যে বাঁশগাছের ছায়া। সমদূরত্বে এই আলো আর ছায়া দেখে মাওরিদের মধ্যে প্রচলিত একটা বিশেষ বাদ্যযন্ত্রের কথা মনে আসছে, যার নাম ভিভো। এই চাঁদের আলো আর বাঁশগাছ, সমস্তই যেন সেই বাঁশিজাতীয় বাদ্যযন্ত্র হয়ে উঠেছে যা দিনের বেলায় নীরব থাকে কিন্তু রাতে চাঁদের আলোর স্পর্শে প্রিয় সব সুর তোলে কল্পনাপ্রবণ মনে। এই সুরের আবহেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
        আকাশ আর আমার মাঝে শুধুই পাতায় ছাওয়া আমার কুটিরের ছাদ। ওখানে গিরগিটি বাসা বেঁধেছে।
        ইউরোপীয় গৃহস্থালীর কয়েদখানা থেকে বহু বহু দূরে আমি চলে আসতে পেরেছি।
        মাওরিদের কুটিরগুলো কখনোই মানুষকে জীবন, প্রকৃতি কিংবা অসীমের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না।” [১]

Noa_Noa_Paul

পল গোগ্যাঁর তাহিতি জার্নাল ‘নোয়া নোয়া’-র সুন্দর বঙ্গানুবাদ করেছেন অরূপরতন ঘোষ (২০১৪, ভারত)। পড়ার পর কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকতে হয়।

কেমন একটা যৌক্তিক অতৃপ্তি। কৌতুহল।

কবি-শিল্পীরা কাজের তাগিদে বিচিত্র জীবনযাপন করে থাকেন। তবে গোগ্যাঁর গল্পটা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না! এমন একটা জবরদস্ত লোক – এইভাবে সব ছেড়ে ‘বনে’ চলে গেল? কেন গেল?

‘নোয়া নোয়া’-র কি আদতে কোনো অর্থ হতে পারে?

 

লেই

পল গোগ্যাঁর(১৮৪৮-১৯০৩) পিতা ছিল এক ফরাসী সাংবাদিক, মা আধা-ফরাসী, অর্ধ্বেক পেরুভিয়ান-স্প্যানিশ। ছোটবেলার একটা পর্ব কাটে লিমায়। প্রথম যৌবনে বনিক জাহাজে কাজ করতেন, তারপর নৌবাহিনীতে।

চতুর। উদ্ধত। গোপনীয়তাপ্রিয়। ১৮৭১-এ জাহাজ ফেলে চলে আসলেন প্যারিস। ততদিনে মা মারা গেছে। মা’র বন্ধু গুস্তাভ আরোসা(Gustave Arosa) গোগ্যাঁর জন্য কাজ জোগাড় করেন। স্টক-ব্রোকারের কাজ।

প্যারিসে তখন শেয়ার বাজার উঠতির দিকে। সবাই টাকা বানাচ্ছে। বুদ্ধিমান গোগ্যাঁ আবিষ্কার করলেন টাকা বানানো কঠিন কোনো কাজ না; এবং রাতারাতি, যেন কোনো মন্ত্রবলে, সকল বোহেমিয়া ধুয়ে মুছে শেয়ারের দালাল বনে গেলেন। দুই বছর পর, ১৮৭৩-এ বিয়ে করলেন এক ড্যানিশ পাদ্রীর কন্যাকে।

*

যতদূর জানতে পারি, বিবাহিত জীবনেই গোগ্যাঁ প্রথম ছবি আঁকা শুরু করেন। সখের বশে। অবসরে। গুস্তাভ আরোসা ছিলেন সৌখিন কালেকটর। এই আরোসার কাছেই গোগ্যাঁ প্রথম ইম্প্রেশানিস্টদের খোঁজ পান। ব্যাঙ্কে একসাথে কাজ করতেন এমিল শুফেনেকা (Emile Schuffenecker)। কর্মসূত্রে বন্ধু। শুফেনেকা ছবি আঁকতেন। গোগ্যাঁকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন লুভে। আদি মাস্টারদের খেলা দেখতেন। নতুনদের প্রদর্শনীও দেখতেন। পিসারোর সাথে পরিচয় হয় (বউ ড্যানিশ হওয়ার সুবাদে?)।

চাকরি, সংসার ও সন্তান উৎপানের(বিয়ের প্রথম নয় বছরে পাঁচ সন্তানের পিতা) পাশাপাশি ছবি সংগ্রহ শুরু করেন পল গোগ্যাঁ। ছবি বেচাকেনার ব্যবসাও করেন কিছুদিন।

এবং অঙ্কন। গোগ্যাঁর শুরুর দিকের ছবিগুলি প্যারিস সালোনের চালু কায়দা্র নকল। তেমন কেউ পাত্তা দিতো না। যদিও এর মধ্যেই পিসারোর কল্যাণে ইম্প্রেশনিস্ট প্রদর্শনিতে জায়গা দখল করেছিলেন।

১৮৮২-তে প্যারিস স্টক মার্কেটে ধস নামে। টানা এগারো বছর কাজ করে, ‘৮৩-তে চাকরি ছেড়ে দেন (নিজেই ছাড়েন, না ছাঁটাই হন – এই ব্যাপারটা স্পষ্ট না। একেক লেখক একেক কথা বলেছেন)।

চাকুরি, সংসার, সন্তান গোগ্যাঁকে চারদিক থেকে আটকে রেখেছিল। এখন এই বেকার অবস্থায় যেন পুরানো ভূতগুলি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গোগ্যাঁ ঠিক করেন পেশাদার চিত্রকর হবেন। বউকে বোঝান খ্যাতি হবে, প্রতিপত্তি হবে। বউও আপত্তি করেন না। তবে কিছুদিন পর আবিষ্কার করেন ব্যাপারটা স্বামীর উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা ছাড়া তেমন কিছু না। হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ছাড়া গোগ্যাঁর ছবি কেউ পুছে না।

জমানো টাকা শেষ হয়ে গেল দ্রুত। আয় রোজগার নাই। স্বচ্ছল সময়ে কেনা মানে, রেনো, মোনে, সেজান বিক্রি করে দিতে হলো একে একে। প্যারিসে বসবাস সম্ভব না।

‘৮৪-তে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে মাদাম গোগ্যাঁ চলে গেলেন বাপের বাড়ি কোপেনহেগেন। কিয়ৎপর আমাদের চিত্রকরও পিছু নিলেন। যদি কিছু হয়!

*

কিছুই হয় না। ড্যানিশ ভাষা জানেন না। রুজি রোজগার নাই। শ্বশুরবাড়ি নিষ্ঠার সাথে চাপ দিতে থাকে- ছবি আঁকার ভূত দূর করো! জীবনটা ঠিক করো!

কোপেনহেগেন খুব কঠিন সময় ছিল গোগ্যাঁর জন্য। এবং মাথার ভিতর চিত্রকর হওয়ার পরিকল্পনাও যেন পাকাপোক্ত হচ্ছিল সেসময়েইঃ

প্রায় প্রায় মনে হয় আমি উন্মাদ কিন্তু প্রায় প্রায়, যখন রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে চিন্তা করি, মনে হয় আমার ভাবনা ঠিক আছে অনেক দিন ধরে দার্শনিকেরা এমন কিছু কথা বলে আসছে যেগুলি অলীক শোনায়, কিন্তু কথাগুলির বিষয়ে আমাদের ভিতর একটা সংবেদন কাজ করে সবকিছু ওই শব্দটার অন্তর্গত রাফায়েল প্রমুখের মধ্যে ওই সংবেদনার জন্ম হয়েছিল চিন্তার আগে, যে কারণে প্রস্তুতিপর্ব, অধ্যবসায় কোনোকিছুই ওনাদের ভিতর সেটাকে ধ্বংস করতে পারে নাই, সব সময় শিল্পী থাকতে পেরেছেন আমার মতে, মহৎ শিল্পীই মহত্তম মনীষার সূত্র; সে’ই সবচাইতে সূক্ষ্ম জিনিসগুলি টের পায়,  অতএব, মগজের অদৃশ্যতম অনুবাদগুলি

যতই ভিতরে যাই, ততই এই অনুভূতিটা আমার মাথা ঘুরিয়ে দেয় যে, ভাবনার অনুবাদ সাহিত্য হতে সম্পূর্ণ আলাদা; দেখা যাবে কে ঠিক কিন্তু যদি আমি ভুল হয়ে থাকি, কেন তোমার আকাদেমি, পুরানো মাস্টারদের সব কায়দা জানা থাকা সত্ত্বেও, একজন মাস্টারের ছবি সৃষ্টি করতে পারে না? পারে না কারণ, ওনারা একক প্রকৃতি সৃষ্টি করিতে পারে না, একক মনীষা, এবং অভিন্ন হৃদয়; কারণ তরুণ রাফায়েলের মাঝে ইন্ট্যুইশন ছিল, এবং রাফায়েলের ছবির ভিতর রেখার এমন কিছু অন্বয় আছে, যা ওনারা হিসাব করে বের করতে অক্ষম…

… …

খোলামনে কাজ করো, আবেগ নিয়ে কাজ করো তুমি, আগিয়ে যাবে, এবং তোমার ভিতর যদি সত্যই কিছু থেকে থাকে, ওনারা তা একদিন ধরতে পারবেই তবে সবচেয়ে বড় কথা, কোনো ক্যানভাস নিয়ে খুব বেশি ঘাম ঝরিও না, মহৎ আবেগ মুহূর্তে অনুদিত হয়, তার স্বপ্ন দেখো, এবং খোঁজ কোরো সরলতম ভাবে

               (কোপেনহেগেন থেকে শুফেনেকাকে লেখা চিঠির অংশবিশেষ, জানুয়ারি ১৪, ১৮৮৫)[২-৪]

নানা কারণে থাকতে না পেরে ১৮৮৫-তে কোপেনহেগেন ত্যাগ করেন পল গোগ্যাঁ[৩-১]। পাকাপাকি ভাবে। বউ-বাচ্চা পেছনে থেকে যায়। গোগ্যাঁ আর কখনো ওঁদের সাথে একত্রে বসবাস করেন নাই।

 

পোন্ত-আভেন

পেশাদার চিত্রকর হবার স্বপ্ন নিয়ে প্যারিসে ফিরে আসলেন। নানান দুর্ভোগের মধ্যে বসে ছবি আঁকলেন কিছু। ছবিগুলি বিক্রি হলো না। টাকার অভাবে আবার প্যারিস ত্যাগ করতে হলো। গোগ্যাঁ এবার গেলেন ব্রিটানির পোন্ত-আভেন পল্লীতে।

এখানকার মানুষগুলি অত সভ্য না। বরং কিছুটা ‘প্রিমিটিভ’। সমুদ্র আছে। বাতাস আছে। গাছপালা। চাষাভূষা। সব মিলে পোন্থ-আভেনে গোগ্যাঁর ভিতর যেন নতুন একটা উদ্দীপনা জেগে ওঠে। এতদিন ধরে তৈরি হওয়া ভাবনাচিন্তা পরিণতি পেতে আরম্ভ করে।

*

এ’ সময় এমিল বার্নার্ডের (Emile Bernard) সাথে গোগ্যাঁর বন্ধুত্ব বেশ আলোচিত। বয়সে বিশ বছরের ছোট হলেও প্রতিভাবান বার্নার্ড গোগ্যাঁর ভিতর একটা সৃষ্টিশীল চাঞ্চ্যল তৈরি করেছিলেন।

বার্নার্ড, শেখুযিয়ে (Paul Sérusier), লাভাল (Charles Laval) প্রমুখ অনুজ শিল্পীদের সাথে যুক্ত হয়ে গোগ্যাঁ প্রচুর ছবি আঁকেন পরবর্তী কয়েক বছর।

বার্নার্ডের বন্ধু ছিলেন সিম্বলিস্ট লেখক, সমালোচক আলবার্ট ওহিয়ে(Albert Aurier)। ওহিয়ে ইতিমধ্যে ভ্যান গখ এবং গোগ্যাঁকে নিয়ে লিখেছেন। মালার্মের প্রতীকবাদী লেখকচক্রের সাথে ওহিয়ে গোগ্যাঁর আলাপ করিয়ে দেন।[২-১]

*

১৮৮৬-তে গোগ্যাঁ ও ভিনসেন্ট ভ্যান গখের প্রথম দেখা হয়। প্যারিসে।

ইউরোপের কোনো কিছুই গোগ্যাঁর ভাল লাগতো না, ভিনসেন্টকে ভাল লেগেছিল। সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুই চরিত্র। ওনাদের প্রথম সাক্ষাৎ নিয়ে ফ্লেচারের বর্ণনা এরকম- “গোগ্যাঁ তখনো উপলব্ধির পথে পথে নিজেকে খুঁজছেন গোগ্যাঁ শক্ত, সম্ভ্রান্ত, নাগরিক আর ভ্যান গখ ইতিমধ্যে আপন মননে পূর্ণ বিকশিত হয়তো আদ্যপান্ত বিকশিতই ছিলেন শান্ত, বিনয়ী এক ওলন্দাজ চাষী, যার ভিতর লুকানো ছিল ধর্ম ও জান্তবতার এক মরমী মিশ্রণ[৩-২]

ভিনসেন্ট ও গোগ্যাঁর চিঠি চালাচালি শুরু হয়।  শিল্পকলা, কবিতা, সভ্যতা, বিজ্ঞান, চার্চ- নানা বিষয় নিয়ে বাক্যালাপ। জাপানি পেইন্টারদের কায়দায় ছবি বিনিময় করেন। এবং ১৮৮৭-তে বন্ধু লাভালের সাথে সমুদ্রে চলে যান। প্রথমে পানামা, ফেরার পথে মার্টিনিক দ্বীপ। ছয় মাসের মতো থাকেন। প্রায় মরো-মরো অবস্থায় ফিরে আসেন।

মার্টিনিকে বেশ কিছু ক্যানভাস হয়েছিল। দক্ষিণ সমুদ্রের আলো, রঙ… তীব্র রঙ… ‘আদিম’ সরল জীবনের ছবি… কেউ কেনে না… কেনে ভ্যান গখের ভাই থিও।

A Seashore, Martinique, 1887

A Seashore, Martinique, 1887

১৮৮৮-র গ্রীষ্মে পোন্ত-আভেনে গোগ্যাঁ ও এমিল বার্নার্ডের ভিতর কিছু তাত্ত্বিক আদানপ্রদান ঘটেছিল। দুইজনই ইম্প্রেশনিজম থেকে পালানোর উপায় খুঁজছিলেন। এ’ সময় গোগ্যাঁর চিন্তাভাবনার একটা ক্ষুদ্র নমুনা বার্নার্ডকে লেখা নিচের এই চিঠিতে পাওয়া যাবে –

সঙ্গীত এবং সংখ্যা এককনির্ভর গোটা সুরতন্ত্রই এই নিয়মের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কান এই বিভাজনগুলির সাথে অভ্যস্ত একক বা মাত্রা ঠিক করতে একটা সঙ্গীতযন্ত্র লাগে, তবে তুমি অন্য কিছুও বেছে নিতে পারো, এবং স্বর, আধা-স্বর, পোয়া-স্বর একে অপরের পিছু নেবে অন্যথা হলে বেসুর লাগবে এই ‘বেসুর’ বুঝতে কান যতটা অভ্যস্ত, চোখ কিন্তু ততটা না, এবং রঙের ক্ষেত্রে বিভাজনের সংখ্যাও সুরের তুলনায় বেশি, এবং শুধু তা’ই না, রঙের আছে একাধিক একক

সঙ্গীতযন্ত্রে তুমি একটা স্বর(tone) থেকে শুরু করো ছবিতে শুরু করো রঙের একাধিক রেশ থেকে ধরো, শুরু করলে কালোতে এবং ভাগ হলে শাদায়- এটা প্রথম একক, সহজতম এবং সর্বাধিক ব্যবহৃত কিন্তু রংধনু্র সাত রঙের সাতটা একক নাও, মিশ্র রঙগুলিও নাও, এবং তোমার এককের সংখ্যা বেশ সম্মানজনক জায়গায় পৌছাবে কী সাংঘাতিক সংখ্যার ভীড়, সত্যি যেন এক চৈনিক ধাঁধা! সুতরাং অবাক হওয়ার কিছুই নাই যে একজন রংশিল্পীর(colourist) বিজ্ঞানটাকে বোঝার জন্য চিত্রকররা তেমন চেষ্টা করেন নাই সাধারণ মানুষও এসব কম বোঝে অথচ প্রকৃতির সাথে অন্তরঙ্গ হবার কী শক্তিশালী একটা উপায়ই না লুকানো এখানে![২-৫]

Self-Portrait with portrait of Emile Bernard (Les Misérables) - Dedicated to Van Gogh, France, 1888

Self-Portrait with portrait of Emile Bernard (Les Misérables) – Dedicated to Van Gogh, France, 1888

বার্নার্ড সমতল ক্যানভাসে সরল এবং তীব্র ফর্মে ছবি আঁকার একটা কায়দা আবিষ্কার করেছিলেন যা প্রচলিত ইম্প্রেশনিস্ট ছবি থেকে ভিন্ন। বলা হয় যে গোগ্যাঁ ও ভ্যান গখ – উভয়কেই এমিল বার্নার্ড প্রভাবিত করেছিলেন। পরবর্তীতে গোগ্যাঁ যখন আরো বিখ্যাত হন, বার্নার্ডের ‘ক্লইসনিজমের’ (Cloisonnism) প্রতি ওনার ঋণ কখনো স্বীকার করেন নাই। এই নিয়ে বিতর্ক আছে।

*

১৮৮৮-তে ভিনসেন্ট গোগ্যাঁকে একটা লজিঙের প্রস্তাব দেন। আর্লে এসে একত্রে কাজ করার, রুজি ভাগ করে নেয়ার প্রস্তাব। পাঁচ মাস ঘোরালেও[৪] শেষমেশ আর্ল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন গোগ্যাঁ, ভিনসেন্টের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখার সুবিধা আছে বিধায়। ভিনসেন্ট থিওর ভাই, থিও প্যারিসে গোগ্যাঁর ছবি বিক্রি করবে!

পরবর্তী কাহিনী তো নতুন করে বলার কিছু নাই। ভিনসেন্টের সাথে গোগ্যাঁর না মানুষ হিসাবে কোনো মিল ছিল, না শিল্পভাবনায়। সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুই প্রতিভা একত্রে বসবাস করতে পারলো না। আজব নাটক ঘটিয়ে যে যার রাস্তায় চলে গেল।

Van Gogh Painting Sunflowers- Arles, France,1888

Van Gogh Painting Sunflowers- Arles, France,1888

Night café, Arles- Arles, France, 1888

Night café, Arles- Arles, France, 1888

থিওকে লেখা ভ্যান গখের চিঠির অংশবিশেষঃ

শেষ চিঠিতে অবশ্য চিৎকার করে করে ওনার মুখোশ আর দস্তানা ফেরত চাইতে ভোলেননি গোগ্যাঁ, যা লুকানো ছিল আমার হলুদ ছোটবাড়ির ছোট ঘরটাতে যত দ্রুত পারি এই বালশুলভ বস্তুগুলি পার্সেল করবো আমি আশা করবো উনি জীবনে এসবের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবহার করবেন না

শারীরিক ভাবে গোগ্যাঁ আমাদের চাইতে বেশী শক্তিশালী, সুতরাং ওঁর আবেগও নিশ্চয়ই আমাদের চাইতে তীব্রতর হয়ে থাকবে তার উপর উনি সন্তানদিগের পিতা, এবং ডেনমার্কেও ওনার স্ত্রী-সন্তানাদি আছে, এবং একই সময় উনি পৃথিবীর অপর প্রান্তে, মার্টিনিক ভ্রমণে উদ্যত ভাবলেই ভয়ঙ্কর লাগে, এসবের কারণে না জানি কত বিসদৃশ কামনা আর প্রয়োজন ওনার ভিতর তৈরি হয়ে থাকবে[৫]

*

আর্ল থেকে পোন্ত-আভেনে ফিরে আসলেন গোগ্যাঁ। আরো বিখ্যাত হতে লাগলেন। এবং আরো গরীব।

পোন্ত-আভেনে তোষামোদকারী প্রচুর, কিন্তু প্যারিসের ডিলারা আগ্রহ দেখায় না। শেয়ারের দালালী করে তিরিশ-চল্লিশ হাজার ফ্রাঙ্ক কামাতেন একেক বছর। অথচ ছবি আঁকতে এসে মিসকিনের হালে বেঁচে থাকার পয়সাও জোগাড় হচ্ছে না।

Yellow Christ- Pont-aven, France, 1889

Yellow Christ- Pont-aven, France, 1889

খরচ কমানোই গোগ্যাঁর ইউরোপ ছাড়ার অন্যতম কারণ। তবে এটাই কি একমাত্র কারণ? এ্যডভেঞ্চার ভালবাসতেন। তলোয়ার খেলতেন, মুষ্টিযুদ্ধ করতেন, সাঁতার কাটতেন। তাছাড়া, মনের গভীরে, নিজের ছবি নিয়েও যেন খুব একটা তৃপ্ত ছিলেন না গোঁগ্যা। পোন্ত-আভেন থেকে অন্য কোথাও যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছিল।

এবং এর সাথে যুক্ত হয়েছিল ওনার আদি ও অকৃত্রিম ইউরোপ-বিদ্বেষ।

কী ভয়াবহ এই নিরাপত্তাকামীতা! এই গাধার খাটুনি! সবাইকে কেবল টাকার পিছেই ছুটতে হবে আজীবন? সেই শান্তি কই যা বোধের অতীত? লেখা হচ্ছে, আঁকা হচ্ছে যত বানোয়াট ভান। সত্যিকারের শিল্প অন্যখানে। জীবন অন্য কোনোখানে। গোগ্যাঁ সেই প্রকৃতর ছবি আঁকবেন।

স্ত্রীকে লেখা চিঠির অংশ (ফেব্রুয়ারি, ১৮৯০):

“এমন একটা দিন আসবে, হয়তো খুব শিগগির, যখন আমি নিজেকে একটা সাগরদ্বীপে পত্রপল্লবের আড়ালে লুকিয়ে ফেলতে পারবো বেঁচে থাকবো আনন্দে, শান্তিতে, শিল্পে নতুন এক পরিবারের সাথে, ইউরোপীয় অর্থকষ্টের থেকে শতহস্ত দূর তাহিতির সেই সুন্দর গ্রীষ্মমন্ডলীয় রাতের নীরবতায়, আমি শুনতে পাবো আমার হৃদস্পন্দনের সেই মিষ্টি মৃদু গান, যা মিশে যাবে আমার পরিবেশের রহস্যময় সত্তার সাথে অবশেষে মুক্ত, টাকার সমস্যা থেকে দূরে, ভালবেসে, গান গেয়ে মরতে পারবো[২-২]  

মার্টিনিকে বেশিদিন থাকেন নাই। একাও যান নাই। তবে ধরে নেয়া যায়, মার্টিনিক অভিজ্ঞতাই গোঁগ্যার তাহিতিযাত্রার বাস্তব প্রস্তুতি। কিন্তু তাহিতিই কেন? এবং পাকাপাকিভাবে সভ্যতাকে ছেড়ে যাওয়া্র বাসনাই বা কেন? এর একটা উত্তর পাওয়া যায় উইলেমসেন(willemsen) নাম্মী এক ড্যানিশ চিত্রকরকে লেখা চিঠিতেঃ

        “আমি তাহিতি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি তাহিতি, পশ্চিম সাগরের ছোট একটা দ্বীপ; যেখানে বেঁচে থাকার জন্য টাকার দরকার হয় না অতীতের সব দুর্ভাগ্য ভুলে যেতে চাই, অন্যের চোখে মহিমান্বিত না হয়ে মুক্তভাবে ছবি আঁকতে চাই, এবং ওখানেই মরতে চাই এখানে বিস্মৃত হয়ে আর আমার সন্তানরা যদি কখনো চায় এবং চলে আসতে পারে তাহিতিতে, আর কোনো পিছুটান থাকবে না আমার, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারবো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ যুগ অপেক্ষা করছে ইউরোপে; সোনার সাম্রাজ্য সবকিছু পচে গলে গেছে, এমনকি মানুষ, এমনকি শিল্প অন্তত ওখানে, অফুরান উষ্ণ আকাশের নিচে, চমৎকার উর্বর মাটির উপরে, একজন তাহিতিয়কে খাবারের জন্য শুধু হাত বাড়ালেই চলে; কাজ করতে হয় না অথচ এই ইউরোপে সবাই কী নিদারুণ দুর্দশার শিকার, পুরুষ ও মহিলারা টিকে আছে কেবল বিরতিহীন গাধার খাটুনি খেটে, শীতের সাথে, ক্ষুধার সাথে যুদ্ধ শেষ হয় না অন্যদিকে তাহিতিয়রা, ওই অচেনা বেহেশতের সুখী বাসিন্দারা, কেবল জীবনের মিষ্টতার সাথেই পরিচিত ওদের জন্য বেঁচে থাকার মানে কেবল গান গাওয়া আর ভালবাসা (তাহিতি লেকচার, ভ্যান ডার ভির) ওখানে একটু গুছিয়ে বসার পর নিজেকে মহান শিল্প সৃষ্টির কাজে উৎসর্গ করতে পারবো আমি, শিল্পজগতের এইসব হিংসা থেকে, ফালতু বানিজ্যের প্রয়োজন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত[২-২]

                   (জে. এফ. উইলেমসেনকে লেখা চিঠির অংশ, পোন্ত-আভেন, শরৎ ১৮৯০)

অর্থাৎ, জনৈক ভ্যান ডার ভির তাহিতির উপর অতিরঞ্জিত কোনো বক্তৃতা করেছিলেন কোথাও, যেই বক্তৃতা গোগ্যাঁর কানে আসে। এবং তাহিতির পোকা মাথায় ঢুকে যায়।

এইতো চাই! তাহিতি গেলে নোংরা পশ্চিমা শেকলগুলি খুলে ফেলা যাবে, নিজের ছবিকেও মুক্ত করা যাবে! গোগ্যাঁ হবেন গ্রীষ্মমন্ডলের প্রথম চিত্রকর।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। হিজরতের ঘোষণা দিয়ে ফেললেন গোগ্যাঁ। প্রতীকবাদী বন্ধুরা হই হই করে উঠলো। প্যারিসে তিরিশটা ছবি বিক্রি করে ৯,৬৩৫ ফ্রাঙ্ক পাওয়া যায়[৯-১]। চারুকলা বিভাগ থেকে একটা কমিশনও জোটে। প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন! ১৮৯১-এর মার্চে, গোগ্যাঁ কোপেনহেগেন গিয়ে স্ত্রীকে সাথে আসতে অনুরোধ করেন। মাদাম গোগ্যাঁ রাজি হন না।

অবশেষে ১৮৯১-এর চৌঠা এপ্রিল, বন্ধুদের আবেগে টলমল এক বিদায় সম্বর্ধনার ভিতর দিয়ে, পল গোগ্যাঁ তাহিতির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।

এ’ প্রসঙ্গে মমতাময় কিছু কথা লিখেছেন গমব্রিচঃ

“… গোগ্যাঁ সম্পূর্ণ ইউরোপকেই বিদায় জানিয়ে তাহিতি পাড়ি জমান সরল জীবনের খোঁজে কারণ, ততদিনে উনি পরিষ্কার ভাবে জেনে গিয়েছিলেন চিত্রকলা কৃত্রিম হয়ে পড়ছে চালাকি আর জ্ঞানের স্তুপে চাপা পড়া ইউরোপীয় মানুষ তার শ্রেষ্ঠ গুণটার থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে– অনুভূতির শক্তি ও তীব্রতা, এবং তা সরাসরি প্রকাশ করার উপায় 

গোগ্যাঁ অবশ্য প্রথম শিল্পী ছিলেন না যিনি সভ্যতা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন শৈলী নিয়ে শিল্পীরা যতই সচেতন হয়েছেন, ততই রীতির প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছেন নিছক দক্ষতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন নাই এমন একটা শিল্প কামনা করেছেন যার কায়দাগুলি শেখা যায় না, এমন এক শৈলীর জন্য অধীর হয়েছেন যা কেবল শৈলীই না, বরং আবেগের মতো শক্তিশালী কোনো কিছু[৬-১]

 

দক্ষিণ সাগর

পল গোগ্যাঁর প্রথম তাহিতিবাসের কাহিনী, এবং সেই সময়কার রোমান্টিক আবেগ উত্তেজনা ‘নোয়া নোয়া’-র সাপেক্ষে বুঝে নেয়া সম্ভব। জার্নালে লিখিত ঘটনার কিছু কিছু প্রমাণিত, অনেক অভিযানেরই কোনো সাক্ষ্য নাই। ধরে নেই ওগুলি উনি বানিয়ে বানিয়েই লিখেছেন। ‘নোয়া নোয়া’ হয়তো আদতে কোনো জার্নালই না! হয়তো পুরাটাই[১০] ইউরোপীয়দের কাছে তাহিতির ছবিগুলি বিক্রির উদ্দেশ্যে লেখা রংচড়ানো বিজ্ঞাপন! সিম্বলিজমে প্রভাবিত ছিলেন, স্মৃতি থেকে আঁকতেন, কল্পভাষ্য লিখবেন অস্বাভাবিক কিছু না। ‘নোয়া নোয়া’ একটা ভেজাল মিশ্রিত ফিকশন ছাড়া আর কিছু না।

তবে তাতে কিছু যায় আসে না। গোগ্যাঁর প্রথম তাহিতিবাসের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে, রূপক আকারে পড়তে হবে ‘নোয়া নোয়া’। পারলে ছবিগুলি আগে দেখে নিতে হবে।

Orana Maria (We Hail Thee Mary) (First Tahiti period, 1891)

Orana Maria (We Hail Thee Mary) (First Tahiti period, 1891)

 

সেজানের সাথে আলাপ থাকলেও কখনো ওনার শিষ্য হতে চান নাই (উল্লেখ্য, সেজানের হাত ধরেই পরবর্তীতে কিউবিজমের আমদানি হয়[৬-২]। বৈজ্ঞানিক ইম্প্রেশনিজম থেকে সরে এসেছিলেন পোন্ত-আভেন পর্বেই। বড় শিল্পীদের ভিতর বড় যুক্তি কাজ করে।

যদিও প্রথম মহাযুদ্ধ দেখার কপাল ওনার হয় নাই, তথাপি এই কথা সহজেই অনুমেয় যে, ছবির জগতে বিজ্ঞানের মাদকতা নিয়ে গোগ্যাঁর মনে গভীর সন্দেহ ছিল। শিল্পকলা যেদিকে অগ্রসর হচ্ছে, সেদিকে না গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোথাও চলে যেতে চেয়েছিলেন গোগ্যাঁ। একাই। আঁকতে চেয়েছিলেন এক আদিম ঈশ্বর!

ছবি, জার্নাল সবখানেই তাহিতিকে একটা মাটির বেহেশত হিসাবে উপস্থাপন করেছেন – যেখানে মুদ্রাব্যাবস্থা নাই, ইঁদুর-দৌড় নাই, মানুষ যেখানে প্রকৃতিকে ভোগ করতে চায় না, প্রকৃতির সাথে মিশে নিজেকে আবিষ্কার করতে চায়। সভ্য-মূল্যবোধ যেখানে অবান্তর!

*

প্রথম তাহিতিবাস স্থায়ী হয় প্রায় দুই বছর। এই সময় ফ্রান্সে গোগ্যাঁর পরম বন্ধু ছিলেন ড্যানিয়েল ডি মনফ্রেইড। নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বইপত্র, টাকা-পয়সা, রঙ – যা যা দরকার সব পাঠাতেন এই ভদ্রলোক। ‘নোয়া নোয়া’-র কাব্য ব্যতিরেকে, গোগ্যাঁর প্রথম তাহিতিবাসের কিছু খন্ডচিত্র তুলে ধরার জন্য মনফ্রেইডকে লেখা চিঠির এই টুকরাগুলি যুক্ত করা হলো।

নভেম্বর ৭, ১৮৯১

আমার প্রিয় ড্যানিয়েলঃ

      মনে হয় প্যারিসে সবাই আমাকে ভুলে যেতে শুরু করেছে, কেউ কিছু লেখে না, আর এখানে আমি খুবই নিঃসঙ্গ বোধ করি, যেটুকু ভাঙা ভাঙা তাহিতি জানি, সেটুকুই বলি হ্যা, প্রিয় বন্ধু, ফরাসীর একটা শব্দও না

… …

তুমি জানতে চেয়েছো আমি কী করছি বলা শক্ত, কারণ আমি নিজেও জানি না যা করছি তার মূল্য কতখানি

      মাঝে মাঝে মনে হয় ভাল, তবে কাজগুলির কিছু ভয়াবহ দিকও আছে এখনো তেমন কিছু করি নাই নিজের ভিতরে খুঁড়ে যাচ্ছি, প্রকৃতির ভিতরে না, একটু ছবি আঁকা শিখতে চাচ্ছি; এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আমি প্যারিসে বসে আঁকার জন্য বিষয়গুলিও জড়ো করছি – এ থেকে যা বোঝার বুঝে নাও এর বেশি বলতে গেলে আমার গল্প বানাতে হবে, যা আমি ফিরে আসার আগেই তুমি ভুলে যাবে…[১১-১]                                                          

Her name is Vairaumati (First Tahiti period, 1892)

Her name is Vairaumati (First Tahiti period, 1892)

Are you jealous, (First Tahiti period, 1892)

Are you jealous, (First Tahiti period, 1892)

মার্চ ১১, ১৮৯২

আমার প্রিয় ড্যানিয়েলঃ                                                                  

      তোমার চিঠি পেয়ে যে কী ভাল লেগেছে তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না চিঠি আমার কাছে দুষ্প্রাপ্য ফলের মতো; তাহিতি আসার পর এত কম চিঠি পেয়েছি আমি এখনো ন…-র কাছ থেকে কিছু পাই নাই এবং এ নিয়ে আমি কিছুটা চিন্তিত; তার কাছে যে টাকা পাই শুধু সে জন্য না, বরং এ জন্য যে আমি জানিনা এখন কীসের উপর নির্ভর করবো তুমি ঠিক বলেছো বন্ধু, আমি একজন শক্ত মানুষ, যে ভাগ্যকে বাঁকাতে পারে আমি তোমাকে বলছি, গত পাঁচ বছরে আমি যা করেছি তা একটা বিশাল অর্জন! পেইন্টার হিসাবে দুর্দশার কথা কিছুই না বলা – বরং জীবিত থাকার সংগ্রামের কথা বলা, এবং কখনোই ভাগ্যের জোরে না!

      মাঝে মাঝে ভয় হয়, না জানি কী ভেঙে পড়ে, কতই না ফাঁটলের শব্দ শুনছি চারপাশে! যাই হোক, সামনে এগিয়ে আমাদের যেতেই হবে; পথের শেষে মহান নিরাময় অপেক্ষা করছে

      তোমাকে আমার একটা গোপন কথা বলবো আমি যা করছি তার ভিতর বিপুল পরিমাণ যুক্তি আছে এবং আমি কাজ করছি একটা নিয়ম অনুযায়ী সব সময়ই জানতাম একটা একটা দিন ধরে আগাতে হবে আমাকে, তো স্বাভাবিক ভাবেই আমার নিজের মেজাজকে মানাতে হয়েছে কাল কি হবে সেটা ভেবে শক্তি অপচয় না করে আমি সবকিছু বর্তমানে ঢেলে দেই, যোদ্ধার মতো, যে যুদ্ধ শুরু হবার আগ পর্যন্ত নড়াচড়া করে না, শক্তি সঞ্চয় করে রাতে ঘুমাতে যাবার সময় নিজেকে বলি- আরেকটা দিন পাওয়া হলো কালকে আমি মারা যেতে পারি[১১-২]                                                                                                                    

বলা বাহুল্য, গোগ্যাঁ কঠিন বস্তু। এত সহজে মরার পাত্র না।

দক্ষিণ সমুদ্রের আলোয় ছবি তৈরি হয় অনেক। সরল জীবনের ছবি। আদিমতার গন্ধমাখা। ইউরোপের চলতি ধারা থেকে, এমনকি গোগ্যাঁর নিজের পোন্ত-আভেন পর্বের ছবি থেকেও  যেগুলি আলাদা।

নভেম্বর ৫, ১৮৯২

আমার প্রিয় ড্যানিয়েলঃ

তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, চিঠির উত্তর লিখছি তোমার পাঠানো ৩০০ ফ্রাঙ্ক পেয়েছি যাই হোক, আমরা দেখবো! কিছুদিন চলবে, কিন্তু নিরাপদজনক পরিমান টাকা না পেলে আমি মারকিস যেতে পারবো না, এবং ফিরে আসার আগে একবার মারকিস গেলে খুব ভাল হয় শরীর খারাপ ঠিক অসুস্থ না (এখানে আবহাওয়া চমৎকার), কিন্তু টাকাপয়সা নিয়ে এই দুশ্চিন্তা আমার জন্য ভাল না, এবং আমি অদ্ভুতভাবে বৃদ্ধ হয়ে গেছি, হঠাৎ হয়তো এর কারণ হলো যে, আমার কাজগুলিকে শৃঙ্খলার ভিতর রাখতে গিয়ে, এবং দেনা্র হাত থেকে বাঁচার জন্য, আমাকে প্রায় না খেয়েই থাকতে হচ্ছে সামান্য রুটি আর চা চিকন হয়ে গেছি খুব, গায়ের শক্তি কমে গেছে, এবং পাকস্থলিটাকে ধ্বংস করছি পাহাড়ে গিয়ে কলা শিকার করতে হলে, বা মাছ ধরতে হলে আমার কাজ করা হবে না, তাছাড়া হয়তো রোদে পুড়ে অসুস্থ হয়ে যাবো

       ওহ! আর কত দুর্ভোগ পোহাতে হবে এই অভিশপ্ত টাকার জন্য![১১-৩]          

Mysterious Water(Pape Moe) - French Polynesia, (First Tahiti period, 1893)

Mysterious Water(Pape Moe) – French Polynesia, (First Tahiti period, 1893)

Hina, Moon Goddess & Te Fatu, Earth Spirit - French Polynesia (First Tahiti period, 1893)

Hina, Moon Goddess & Te Fatu, Earth Spirit – French Polynesia (First Tahiti period, 1893)

ফেব্রুয়ারী, ১৮৯৩

আমার প্রিয় ড্যানিয়েলঃ

তোমাকে কী লিখবো হাতে একটা ফুটা পয়সাও নাই এবং আমি আগামী তিন মাসের ভিতরেও ফ্রান্সের জন্য রওনা হবার কথা ভাবতে পারবো না, যদি ধরেও নেই যে মন্ত্রী মহাশয় আমাকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন যদি উনি সেটা না করেন, আমি সত্যি জানিনা কীভাবে এখান থেকে বের হবো

… …

আমার স্ত্রী আমার ছবি বিক্রি করে ৮৫০ ফ্রাঙ্ক পেয়েছে বলে লিখেছে কিন্তু ও নিজেও অভাবে থাকে টাকাটা ও রেখে দিলে তুমি কিছু মনে করো না

… …

মনে হয় উত্তরে আমার সফলতা বাড়ছে লন্ডনের একজন চিত্রকর আমার স্ত্রীকে বলেছে আমার নাকি অবশ্য অবশ্যই ইংল্যান্ডে প্রদর্শনী করা উচিৎ ইউরোপে ফিরে আসাটা জরুরি হয়ে পড়েছে ঈশ্বর! কীভাবে যে আমি রেগে উঠি রাগই আমাকে চালিয়ে নিচ্ছে

… …

বেচারা ওহিয়ে(Albert Aurier) মরে গেল আমাদের কপাল সত্যি মন্দ ভ্যান গখ এবং তারপর ওহিয়ে, একমাত্র সমালোচক যে সত্যি আমাদের বুঝেছিল এবং যে একদিন কাজে আসতো[১১-৪]                                           

স্বভাবতই আশাবাদী হয়ে উঠছিলেন গোগ্যাঁ। ইউরোপে কদর বাড়ছে। মানুষ সম্ভবত মূল্য বুঝতে শিখছে অবশেষে! প্যারিসে আসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকেন। প্রদর্শনী করতে হবে এবার! বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে!

অনেক ঝামেলার পর দেশে ফেরার পয়সা জোগাড় হলো।

মাখ্‌সেইল বন্দর, অগাস্ট ৩, ১৮৯৩

প্রিয় ড্যানিয়েল,                                        

আজকে পৌছালাম- বুধবার- দুপুর বারোটায়, পকেটে চার ফ্রাঙ্ক নিয়ে হয়তো অবাক হচ্ছো, যেহেতু তুমি জানো রওনা হবার আগে আমি ১০০০ ফ্রাঙ্ক পেয়েছিলাম কিন্তু ধার দেনা শোধ করার পর, বাকি থাকলো ৬৫০ ফ্রাঙ্ক; তার মধ্যে কপাল খারাপ; পঁচিশ দিনের উপর অপেক্ষা করতে হলো নউমিয়াতে, হোটেল শস্তা ছিল না, এবং মালামাল শিপিঙের খরচ, ইত্যাদি… জাহাজে অবস্থা এত খারাপ ছিল যে আমাকে বাড়তি পয়সা দিয়ে সেকেন্ড ক্লাসে উঠতে হলো ঈশ্বর, কি জঘন্য জাহাজ! তিনশ যাত্রী ছিল, তৃতীয় শ্রেনীতে জনপ্রতি পঞ্চাশ বর্গ-সেন্টিমিটারের বেশি জায়গা ছিল না তার সাথে যোগ করো মাবে পর্যন্ত খারাপ আবহাওয়া সিডনির ঠান্ডা, এবং লোহিত সাগরের ভয়াল গরম- অবস্থা এমন ছিল যে গরমে পটল তোলা তিনজন যাত্রীর মৃতদেহ আমাদের সমুদ্রে ফেলে দিতে হয়েছে যাই হোক, সব ভাল যার শেষ ভাল- আমি এখন এখানে[১১-৫]

মনফ্রেইড থাকার ব্যবস্থা করে দেন প্যারিসে। এবং সৌভাগ্যবশত, এ’ সময়ই গোগ্যাঁর এক চাচা গত হন। মৃত্যুর সময় ভাতিজার জন্য ১৩,০০০ ফ্রাঙ্ক রেখে গিয়েছিলেন। টাকাটা সাথে সাথে কাজে লেগে যায়। গোগ্যাঁ প্রদর্শনীর আয়োজনে লেগে পড়েন।

*

অনেক আশা, অনেক উত্তেজনা! আত্মবিশ্বাসের অভাব কখনোই ছিল না। তাহিতির ছবিগুলি বিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু প্যারিস খুব নিষ্ঠুর শহর। এখানে কারো চোখ সহসা কপালে ওঠে না। চৌচল্লিশটা ক্যানভাসের মধ্যে কেবল এগারোটা বিক্রি হয়, নামমাত্র মূল্যে।

প্রতিটা ছবি এখন বিখ্যাত হলেও ওই সময় তেমন কেউ গা করে নাই। গোগ্যাঁর কপালে জুটেছে সমালোচনা এবং নিগ্রহ।

উপরের এই ছবিটাও প্রথম তাহিতিপর্বে(১৮৯২) আঁকা। নাম "তোমার বিয়ে কবে?" ("When are you Getting Married?"), ২০১৫-তে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে[১৩]।  ছবিটা কি গোগ্যাঁর ওই ব্যর্থ প্রদর্শনীতে ছিল?

উপরের এই ছবিটাও প্রথম তাহিতিপর্বে(১৮৯২) আঁকা। নাম “তোমার বিয়ে কবে?” (“When are you Getting Married?”), ২০১৫-তে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে[১৩]।  ছবিটা কি গোগ্যাঁর ওই ব্যর্থ প্রদর্শনীতে ছিল?

ভিনসেন্টের থিও ছিল। সেজানের ছিল বড়লোক পিতা। গোগ্যাঁর তেমন কোনো সুবিধা ছিল না। আজীবন ওনাকে টাকার ধান্দা করে যেতে হয়েছে। এই মর্মে অনেকে তাঁর কঠিন সমালোচনা করে থাকেন, অর্থলোভী শিল্পী হিসাবে[৮]। দায়ীত্বজ্ঞানহীন স্বামী, বহুগামী প্রেমিক, ভালমানুষ ভিনসেন্টের বাটপার বন্ধু- এসবই আমাদের কাছে মানুষ গোগ্যাঁর পরিচয়। অনেকে এও বলেন যে গোগ্যাঁ তাহিতি গিয়েছিলেন আর কোনো কারণে না, রোদ পোহাতে, এবং কমবয়সী পলিনেশিয় মেয়েদের সাথে প্রেম করতে[৮]

অভিযোগগুলি অমূলক না। তবে একই সাথে এই কথাও মনে রাখা ভাল যে, গোগ্যাঁ ছিলেন একজন পাগলাটে পর্যায়ের বিদ্রোহী। উন্নাসিকতা, অহঙ্কার ওনার চালিকাশক্তি ছিল। চার্চ, সরকার, স্কুল, বুর্জোয়া মূল্যবোধ, রক্ষণশীলতা, আকাদেমি-নিয়ন্ত্রিত মাঝারি মেধার চিত্রকলা – কোনোকিছুর সাথেই আপোষ করেন নাই কোনোদিন – এবং এখানেই গোগ্যাঁ ও ভিনসেন্টের তাত্ত্বিক মিলটা খুঁজে পাওয়া যায়।

মধ্যচল্লিশে, তাহিতি থেকে ফিরে যেই বীরের অভ্যর্থনা আশা করেছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই তার ছিঁটাফোটাও জুটলো না।

কিন্তু তাতে কী? গোগ্যাঁ গোগ্যাঁই। চাচার টাকা দেদারসে উড়াতে থাকেন। প্যারিসে স্টুডিও ভাড়া নেন। সিম্বলিস্ট বন্ধুদের চায়ের দাওয়াত দিতে থাকেন নিয়মিত। উদ্ভট সাজপোশাকে ঘুরে বেড়ান এক কমবয়সী মুলাটো মডেলের সাথে। এবং কোনো এক শুভদিনে পুরানো ডেরা পোন্ত-আভেনে বেড়াতে আসেন।

তাহিতিফেরত গোগ্যাঁর পোন্ত-আভেন অভিজ্ঞতা মনে রাখার মতো ছিল না। ১৮৯১-এ, দেশ ছাড়ার আগে বাড়িওলার কাছে কিছু ছবি আর স্ক্লাপচার জমা রেখে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দাবী করলে বাড়িওলা সেগুলি ফেরত দিতে অস্বীকার করে। শুরু হয় বিরাট ফ্যাসাদ। গোগ্যাঁ কোর্টে মামলা করে দেন।

তিক্ততার এখানেই শেষ না। কয়েক সপ্তাহ পর, আমাদের আদিম শিল্পী ও প্রাক্তন এ্যমেচার মুষ্টিযোদ্ধা, কিছু স্থানীয় লাফাঙ্গার সাথে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন, এবং কঠিন মার খান। একটা পা ভেঙে যায়[৯-২]

*

যেই পশ্চিমকে গালাগাল দিয়ে চলে গিয়েছিলেন, সেই পশ্চিমে সমাদৃত হবার শেষ আশাটাও নাই হয়ে যাচ্ছে। পোন্ত-আভেনে পা ভাঙার পর, প্রায় মেগালোম্যানিয়াক এই ভদ্রলোকের ভিতর যেন প্রথমবারের মতো, সত্যিকারের এক নৈরাশ্য এসে দানা বাঁধতে শুরু করে।

বউকে কাগজপত্রে তালাক দেন নাই কখনো। মাঝে মধ্যে চিঠি দিতেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কখনো টাকা পয়সা দিতেন না (যদিও স্ত্রীর কল্যাণেই তাহিতির কিছু ছবি ১৮৯২-এ ডেনমার্কে সাড়া ফেলেছিল)। চাচার টাকা থেকে স্ত্রীকে ভাগ দিতে না চাওয়ায় পুরাতন সাংসারিক তিক্ততা নবায়িত হয়। শেষ জীবনে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো রাস্তা আর খোলা থাকে না।

অর্থাৎ পুনরায় ইউরোপ ছেড়ে পালানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাচ্ছিল সবদিক দিয়েই।

ভাঙা-পা কিছুটা জোড়া লাগলে, বাড়িওলার বিরুদ্ধে মামলায় হেরে প্যারিসে ফিরে আসেন গোগ্যাঁ। সব ছবি নিলামে তুলে দেন।

ফ্রান্সে ফেরার পর থেকে পল গোগ্যাঁ, এই বিরাট-শিশু, ধীরে ধীরে মানসিকভাবেও বৃদ্ধ হয়ে যেতে শুরু করেন। শরীরে পোকা ধরে।

১৮৯৫-এ দ্বিতীয়বারের মতো ছেড়ে যান ইউরোপ। আর কখনো ফিরে আসেন নাই।

 

দ্বিতীয় পর্ব

‘নোয়া নোয়া’ যদি হয়ে থাকে তাহিতির রূপকথা, মনফ্রেইডকে লেখা দ্বিতীয় তাহিতিপর্বের চিঠিগুলি[১১] হলো সেই রূপকথার বিনির্মান। গোগ্যাঁর শেষ জীবন তো ছিল ভয়াবহ। আক্ষরিক অর্থেই যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন। অতিরিক্ত তামাক শরীর ধ্বংস করে ফ্যালে। পোন্ত-আভেনে চোট খাওয়া পা যন্ত্রণা দিতে দিতে বিকল হয়ে যায়। স্থানীয় সরকারের সাথে, চার্চের সাথে নানান ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। ধার-দেনা করে জমি কিনে ছাপড়া ঘর তুলেছিলেন একটা। সেই জমির মালিকানা নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়।

অর্থাৎ গোগ্যাঁ, ওনার স্বপ্নের বেহেশতের আদম-হাওয়ার সাথেও শান্তিতে থাকতে পারলেন না শেষ পর্যন্ত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবি এঁকে গেলেন – প্রচুর পরিমান ছবি – রহস্যময় একতার ছবি – যেই ছবি পৃথিবীর প্রয়োজন ছিল সেসময়। এখনো কি প্রয়োজন বলবৎ আছে?

Where Do We Come From What Are We Where Are We Going (Second Tahiti Period, 1897)

Where Do We Come From What Are We Where Are We Going (Second Tahiti Period, 1897)

ভোগবাদী পশ্চিমের সাথে ওনার যুদ্ধ ছিল যতটা, সন্দেহ করা যায়, নিজের ভিতরের পশ্চিমা মানুষটার সাথে যুদ্ধও সেই তুলনায় কিছু কম ছিল না। ব্যক্তি গোগ্যাঁর দ্বিতীয় তাহিতিপর্বের করুণ কাহিনী আসলে মূল্যহীন।

পল গোগ্যাঁর মৃত্য হয় ছয়ই মে, ১৯০৩। মৃত্যুর কিছুদিন আগে, বন্ধু কবি চার্লস মরিসকে লেখা শেষ চিঠিঃ

আমি ভূলুন্ঠিত, কিন্তু আমি হেরে যাই নাই যেই আদিমানুষ অত্যাচারিত হতে হতে হাসে, সে তো অজেয় একবার তুমি বলেছিলে নিজেকে বন্য ভাবাটা আমার ভুল তোমার কথা ঠিক ছিল না আমি আদতে একজন বন্য মানুষই, এবং সভ্যরা এটা ভাবে, কারণ আমার কাজের ভিতর এমন কিছুই নাই যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, শুধুমাত্র আমার চরিত্রের এই বন্যতা ছাড়া, যার জন্য আমি নিজে দায়ী না সুতরাং এটা অননুকরণীয় কাজই ব্যক্তির প্রতিভাস অতএব দুই প্রকারের সৌন্দর্য আছে; একটা হলো সহজিয়া, প্রাকৃতিক ভাবে আসা, আরেকটার জন্ম হয় শ্রম থেকে এই দুইয়ের মিলনে, এবং অদলবদলে সৃষ্টি হয় মহৎ এবং অত্যন্ত জটিল এক সম্পদ সমালোচকরা এখনো এটা আবিষ্কার করতে পারে নাই… সৌন্দর্যের সহজিয়াই যে রাফায়েলের আসল গুণ, ওনার মহৎ বিজ্ঞান এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে সেটা চিনে নিতে বাধা দেয় না রাফায়েল সৌন্দর্য নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন বাদবাকি সব হলো ওই অদলবদল করে নেয়ার প্রক্রিয়া

পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, এবং সর্বোপরী প্রকৃতির অধ্যয়ন শিল্পের ভিতর একটা বিভ্রান্তির যুগ নিয়ে এসেছে, এবং এটা বললে সত্যি বলা হবে যে, আপন বন্যতা হারিয়ে শিল্পীরা এখন এমন কিছু খুঁজে মরছে যা তাদের ভিতরেই আর নাই তারা এখন বিশৃংখল দল নিয়ে চলে এবং কখনো একা বোধ করলেই ভয়ে আধমরা হয়ে যায় একাকীত্ব সবার জন্য ভাল না, কারণ একাকীত্ব বহন করার শক্তি, একা কাজ করার শক্তি সবার থাকে না অন্যের কাছ থেকে আমি যা‘ই শিখেছি, তা’ই আমার জন্য বাধার আকারে উপস্থিত হয়েছে সব সময় এটা সত্য যে আমি কম জানি, তবে যতটুকু জানি তা আমার নিজের 

                                                                                    (এপ্রিল, ১৯০৩, মার্কিস দ্বীপ)[২-৭]

 

The Invocation, French Polynesia (Second Tahiti period, 1903)

The Invocation, French Polynesia (Second Tahiti period, 1903)

ভিনসেন্ট-গোগ্যাঁ ট্র্যাজেডি নিয়ে জীবনীকার জন ফ্লেচার সুন্দর একটা কথা লিখেছিলেনঃ

“শিশুর মতো সরল হৃদয়ের এক শিল্পী, Don Quixote, পরোপকারীতা এবং যাকে এত ভালবাসতেন, সেই নাজারাথের যিশুর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ, ভ্যান গখ শিল্পী হিসাবে মহৎ ছিলেন, মানুষ হিসাবে ছিলেন মহত্তর কিন্তু গোগ্যাঁ, যেমনটা তিনি নিজেই আবিষ্কার করেছেন পরে, মানুষ হিসাবে যতটা, শিল্পী হিসাবে বড় ছিলেন তার চাইতে বহুগুণ বেশি[৩-৩]  

শিল্পী গোগ্যাঁকেই দরকার আমাদের।

“সমূলে উচ্ছেদ করো

শয়তানে ঘেরা যত অরণ্য,

যার বীজ একদিন রোপিত হয়েছিল

শুধুমাত্র মৃত্যুপ্রশ্বাসে!

ধ্বংস করো যাবতীয় আত্মশ্লাঘা!

ধ্বংস করো, ছিন্ন ভিন্ন করে দাও শয়তানদের শরীর,

যেমনভাবে শরতে আমরা নিজ হাতে পদ্ম ফুলের বোঁটা ছিঁড়ে নিই!

   আহ্‌! কী দারুণ তৃপ্তি! বুঝতে পারছিলাম সভ্যমানুষের শেষ চিহ্নগুলোও আমার শরীর থেকে মুছে যাচ্ছে একটা বেশ মোটা ডাল এখন আমাদের কাঁধে এই পাহাড় থেকে আমি ফিরে যাচ্ছি একজন সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে যথার্থই একজন মাওরি হয়ে সুগন্ধ বইছে এখননোয়া নোয়া![৭]

...

সূত্রঃ

[১] নোয়া নোয়া, অনুবাদ অরূপরতন ঘোষ (পৃ-১৮)
[২] Theories of Modern Art: A Source Book by Artists and Critics By Herschel Browning Chipp, Peter Selz
      [১] p-52, [২] p-79, [৩] p-51, [৪] p-58, [৫] p-62, [৬]p-79, [৭] p-84
[৩] Paul Gauguin: His Life and Art, John Gould Fletcher
   [১] p-40, [২] p-60, [৩] p-64, [৪] p-111
[৪] Gauguin’s letter to Vincent
[৫] Vincent’s letter to Theo
[৬] Story of Art, E.H. Gombrich
   [১] p-424, [২] p-444
[৭] নোয়া নোয়া, অনুবাদ অরূপরতন ঘোষ (পৃ-৩১,৩২)
[৮] Gauguin’s erotic Tahiti idyll exposed as a sham
[৯] The Pursuit of Spiritual Wisdom: The Thought and Art of Vincent Van Gogh and Paul Gauguin, Naomi Margolis Maurer
          [১] p-139, [২] p-161
[১০] Paul Gauguin’s Noa Noa
[১১] The Letters of Paul Gauguin to Daniel de Monfreid [E-book]
   [১] p-24 [২] p-26 [৩] p-37 [৪] p-4২, [৫] p-49
[১২] Emile Bernard
[১৩] Gauguin Painting Sells for Record Sum of Almost $300 Million
* wikiart.org

...

মেসবা আলম অর্ঘ্য। মেসবা আলম অর্ঘ্য
কবি ও গদ্যকার

1 Comment

Filed under সারথি

One response to “নোয়া নোয়া / মেসবা আলম অর্ঘ্য

  1. নিয়াজ মাহমুদ

    বাহ। লেখককে সাধুবাদ, ‘করুণ’ এর ‘দারুণ’ এই ভাষ্যটির জন্য।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s